শনিবার, ২৯ মে, ২০২১

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর: মায়াজগতের রূপকার

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মায়াজগতের রূপকার :

জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির শিল্প ঐতিহ্যের ধারায় এক স্বতন্ত্র নক্ষত্র গগন ঠাকুর। গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র গগনেন্দ্রনাথ,অবনীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা গগনেন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ....তবু যেন কিছুটা চর্চার আড়ালেই থেকে গেলেন তিনি।তার বহুমূখী প্রতিভা,সদা তৎপর এবং উৎসুক খোলা মন, বিশ্বের বিবিধ শিল্পধারায় নিরন্তর পরীক্ষা-নীরিক্ষা তাকে সমকালীন আর সকলের থেকে পৃথক করে তুলেছিল।
শুধু চিত্রশিল্পও নয়, নাট্যশিল্পেও তিনি সমান মনোযোগী,ঠাকুরবাড়ির নাট্যচর্চার অবিচ্ছেদ্য নাম।পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিন্তে তাঁর ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন নাটকের সামগ্রিক সজ্জার ভার,বা নিজের অভিনয় গুণেই প্রশংসা আদায় করে নিচ্ছেন সকলের।অন্যদিকে এই গগনেন্দ্রনাথই অনায়াসে লিখে ফেলছেন “ভোঁদর বাহাদুর”এর মতো অসাধারণ সাহিত্য।
রোদেনস্টাইন তাঁর স্মৃতিচারণায় গগনেন্দ্রনাথের সংবেদনশীল মনের উল্লেখ করছেন,বিশ্বশিল্পের নানা প্রকোষ্ঠে তার অবাধ বিচরণের কথাও বলছেন,আবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে আখ্যা দিচ্ছেন অভিনয়ের একজন ‘জাতশিল্পী’ হিসেবে।গগনেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬৭ তে,পিতা গুণেন্দ্রনাথের অকাল প্রয়াণ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে,তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আরেকটি বিষয়েও মিল,তিনিও কবির মতোই স্কুলছুট,প্রথাগত শিক্ষার নাগপাশ এড়িয়ে তৈরী করে নিয়েছেন স্বতন্ত্র স্ব-শিক্ষাধারা। জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে পরিবারের ও এস্টেটের দায়দায়িত্ব এসেছে তাঁর জীবনে,সাময়িক ভুলিয়ে দিয়েছে শিল্প-সাহিত্য-নাট্যচর্চা, আবার সেসব সামলে দীর্ঘদিন পরে হাতে তুলে নিয়েছেন প্রাণের আশ্রয় রঙ-তুলি।ততদিনে কণিষ্ঠ অবনীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন বাংলার শিল্পের অন্যতম মুখ।
প্রথাগত শিল্পশিক্ষা না থাকলেও গগন ঠাকুর দীর্ঘসময় জলরঙের নিবিড় শিক্ষা নিয়েছেন হরিনারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে,পরে প্রাচ্যের,বিশেষত জাপানী ধৌত পদ্ধতিও অনুশীলন করেছেন, জাপানি শিল্পী হিশিদা এবং টাইক্কান এর কাজের ধারার প্রভাব পড়েছে তাঁর ছবিতে।এই ধারার রূপ ধরা ছিল তাঁর করা রবীন্দ্রনাথের “জীবন স্মৃতি” গ্রন্থের মায়াময় অলঙ্করনে।জাপানী ঐতিহ্যবাহী ব্রাশ ও ইঙ্কের আত্মপ্রত্যয়ী চলন এইসব ছবির সম্পদ।
তাঁর ছবির মধ্যে  রঙের  মৃদু অথচ গভীর ব্যাঞ্জনাময় ব্যবহার,আলো-ছায়ার আশ্চর্য চলন, ব্যঞ্জনাময় টোনের ওঠাপড়া ও সুঠাম কম্পোজিশন আমাদের ছবির অন্তরাত্মার কাছে পৌঁছে দেয়।আমরা কখনোই ভুলতে পারবো না নদীতে প্রতিমা বিসর্জ্জন,বা আলো-আঁধারি লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিমাসহ শোভাযাত্রা বা পুরীর মন্দিরের দৃশ্য অথবা পাহাড়ে সূর্যোদয়,নদীনালা ঘেরা বাংলার নিসর্গচিত্র বা বর্ষার ধারাসিক্ত প্রকৃতি,বা বিখ্যাত শ্রীচৈতন্য সিরিজের কাজ.....সব ছবিতেই পেলব মনোমুগ্ধকর একটা ম্যাজিক দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
আবার ১৯১৬ নাগাদ তিনি বদলে ফেলছেন তাঁর দৃষ্টি, একজন প্রগতিশীল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন সামাজিক ত্রুটি বিচ্যূতি, তার দলিল রাখছেন নতুন ধারার ব্যঙ্গচিত্রে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাংলা কার্টুন, ক্যারিকেচার বা স্যাটায়ারধর্মী ছবির অন্যতম জনকও বলা যায় তাঁকে। তৎকালীন সময়ে তাঁর ব্যঙ্গচিত্রধারা অতি আলোচিত ও জনপ্রিয়ও হয়েছিল।আবার এই গগন ঠাকুরই কিউবিজম ঘরানা আত্মস্থ করে নিজর ছবিতে তার রূপ দিচ্ছেন,সমকালীন বিচারে তাও এক অভিনব বিষয়।অর্থাৎ বিবিধ ধারার প্রতি তাঁর আগ্রহ,অনুশীলন,চর্চা ও পড়াশোনা এবং পরিশেষে তার উপস্থাপন লক্ষ্যনীয়।তিনি প্রাচ্য ধারা থেকেও নিচ্ছেন আবার অনায়াসে প্রতীচ্যের কিউবিজম,ইমপ্রেশনিজম থেকেও নিচ্ছেন।  
তিনি ছবির প্রেক্ষাপটকে যেভাবে ভাঙছেন, সাজাচ্ছেন...পরিপ্রেক্ষিতের জ্ঞানকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে দুঃসাহসী নীরিক্ষা সম্পাদন করছেন,জ্যামিতিক আকারকে ছন্দবদ্ধভাবে নিয়ে আসছেন তাঁর কম্পোজিশনে বা যেভাবে স্বল্প রঙের প্যালেটকে অজস্র টোনে ভাগ করে দিচ্ছেন অথবা রেখার সংবেদন তৈরী করছেন –তা তাঁর ছবির প্রতি মনোযোগী করে তোলে আগ্রহী দর্শককে, আপনিই টেনে নিয়ে যায় রূপজগতের অন্তঃপুরে।
...........................................................
চিত্রও তথ্যঋণ -  অন্তর্জাল

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন