শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩

ক্যাথে ক্যোলউইজ(Käthe Kollwitz)

শুরুতেই দুটি ঘটনার কথা জেনে নেওয়া যাক,
ঘটনা এক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তার যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ও এবিষয়ে শিল্পচর্চার জন্য নাৎসী 'গেস্টাপো' বাহিনীর হাতে অপমানিত ও লঞ্ছিত হন শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ,তার ছবির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ হয়, মিউজিয়াম থেকে তার সব ছবি সরিয়ে ফেলা হয় ও তাকে প্রুশিয়ার শিল্পবিদ্যালয় থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়। এর থেকেই বোঝা যায় তাঁর ছবির প্রভাব সম্পর্কে ,এতো বাধা সত্ত্বেও তাঁকে থামানো যায়নি।
ঘটনা দুই: গেরহার্ট হাউপ্টমান এর বিখাত নাটক ‘দ্য ওয়েভার্স’ , যেখানে সিলেসিয়ার বয়নশিল্পীদের জীবনযুদ্ধ,তাদের ওপর নেমে আসা উৎপীড়ন,তাদের ব্যর্থ হয়ে যাওয়া বিপ্লব -এসব ক্যোলউইজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে,তিনি রচনা করেন তিনটি লিথোগ্রাফ ও তিনটি এচিং এর একটি সিরিজ। প্রদর্শিত ও ভূয়সী প্রশংসার পর অপর জার্মান শিল্পী অ্যাডলফ মেনজেল যখন শিল্পীকে স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মান জানানোর সুপারিশ করেন তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় উইলিয়াম কাইজার মনোনয়ন বাতিল করে বলেন “একজন মহিলা শিল্পীকে স্বর্ণপদক দেওয়াটা বড়ো বেশি বাড়াবাড়ি,সম্মান-মেডেল এসব পুরুষের বুকেই শোভা পায়।’’ বলাবাহুল্য ক্যোলউইজ এর ওয়েভার্স সিরিজের কাজগুলি আজও সারা পৃথিবীর শিল্পদর্শক মাথায় করে রেখেছেন, তার কাছে তুচ্ছ সোনার মেডেল নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর।
ক্যাথে ক্যোলউইজ (১৮৬৭–১৯৪৫) জার্মান মহিলা এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী,জন্ম প্রুশিয়ায় ১৮৬৭ সালে, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ছেলেবেলা থেকেই শিল্পের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন, পরবর্তীকালে ১৪ বছর বয়সে শুরু হয় তার যথাযথ শিল্পশিক্ষা, তখন থেকেই ম্যাক্স ক্লিংগার এর কাজ দেখে এবং লেখা পড়ে তিনি বুঝতে পারেন ছবি আঁকিয়ে হওয়ার চেয়ে গ্রাফিক্স এবং ভাস্কর্য তাঁকে বেশি আকর্ষণ করছে। মাতৃকুলসূত্রে তিনি পেয়েছিলেন ধর্মীয় মন, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।তাই তাঁর কাজের মধ্যে উঠে এসেছে চিরকালীন বিত্তহীন মানুষের জীবন যন্ত্রণা,দৈনন্দিন নগরযাপন, সভ্যতার সমতলে যুদ্ধ,হিংসা, মৃত্যু। ছোট থেকেই মৃত্যু দেখেছেন বারবার,জন্মসুত্রে জার্মানীর মানুষ হওয়ায় ভয়ানকভাবে দেখেছেন দুটি বিশ্বযুদ্ধ,দ্বিতীয় যুদ্ধপূর্ব নাৎসী নিপীড়ন ও নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের সামনে সাম্যের বিপন্নতা,যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বস্ত সমাজ ও অর্থনীতি, যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে তাঁর সন্তানের প্রাণ, ভেঙ্গে দিয়েছে তার স্টুডিও ও বাড়ি, নষ্ট হয়ে যায় অজস্র শিল্পকর্ম। ছেলেবেলা থেকেই এতো প্রিয়জনের মৃত্যু দেখেছেন,ভাই-বোন এর মৃত্যু তাঁর মনে এক বিপন্নতার জন্ম দিয়েছিলো। পরবর্তীকালে যুদ্ধে সন্তানের ও পৌত্রের মৃত্যুরও সাক্ষী হতে হয়েছে। এতো মৃত্যু তার মনে এনে দিয়েছিলো, মানসিক বৈকল্য দীর্ঘ অবসাদ ও হ্যালুসিনেশন।তাই হয়তো তাঁর ছবি বাস্তববাদী হয়েও অন্য এক রূপকথার জগতের কথা বলে।তাঁর ছবি সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম যুদ্ধবিরোধী ছবি,দরিদ্রের জীবনযন্ত্রণার ছবি, ধনতান্ত্রিক নিপীড়নের আগ্রাসী মুখে প্রলেতারিয়েতের লড়াইয়ের ছবি,সর্বোপরি সন্তানহারা মায়ের এক চিরকালীন আর্তির ছবি।ক্যোলউইজ এর ছবির বিষয় সুন্দর নয়, অসুন্দরের মর্মবেদনা তাঁর ছবির মূলসুর। তাঁর ছবির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কম রঙের ব্যবহার বা বলা ভালো শুধুমাত্র সাদা ও কালো রঙের ব্যঞ্জনায় সমাজের প্রান্তিক মানুষ, চাষী, শ্রমিক, তাঁতী তাদের ভাঙাচোরা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের ছাপ রেখে গেছেন তাঁর চারকোলে আঁকা অবয়ব চিত্রে, এচিং-লিথোগ্রাফি-উডকাট এ, ভাস্কর্যে। ক্যোলউইজের অজস্র সাদাকালো ছবির মায়ায় আমরা খুঁজে পাই এক সন্তানহারা অসহায় মায়ের বেদনা,হাহাকার। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি, মা ও সন্তানকে ঘিরে বহু রচনা আমাদের মাথা নত করে একজন সভ্য মানুষ হিসাবে।এই হাহাকার বা বোবা কান্না বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাৎসী আগ্রাসন ও যুদ্ধের ভয়াবহতা আমাদের নির্বাক করে,কান্নাকে শব্দহীন করে দেয়, এছাড়া আর কীইবা করার থাকে একজন সাধারণ মানুষের? সভ্যতার সেই কীটক্লিষ্ট, যন্ত্রণাদগ্ধ প্রাণ ক্যোলউইজ আত্মস্থ করেছিলেন নিজের জীবন জুড়ে,সন্ধান করেছিলেন হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে সভ্যতার সংকট, রচনা করেছিলেন তার নির্ভান অবয়ব, মানবতার দলিল। সারাজীবন অজস্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁর ছবি স্থান পেয়েছে বিশিষ্ট মিউজিয়াম এ, প্রদর্শনীতে। প্রুশিয়ান একাডেমী অফ আর্টস এ শিল্পশিক্ষা দিয়েছেন প্রথম মহিলা শিক্ষক হিসেবে। বিশ্বের অন্য দেশে বসবাসের আমন্ত্রণ পেলেও হাজার অসুবিধা ও বাধা  সত্ত্বেও কখনো ছেড়ে চলে যাননি তাঁর মাতৃভূমি। ২২ শে এপ্রিল ১৯৪৫,শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ এর জীবনাবসান হয়।
তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: অন্তর্জাল ও ক্যাথে ক্যোলউইজ মিউজিয়াম 

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০২৩

ভিনসেন্ট যখন শিল্প শিক্ষার্থী

একজন শিল্পীর সৃজনশীলতার পরিমাপ করতে বা তুলনা করতে আমরা আজও তুলনা টানি পাবলো পিকাসো বা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এর,হয়তো আরো অনেক বছর স্কেলের মাপে এই দুটি এককই জ্বলজ্বল করবে। আমরা মুগ্ধ হই ভ্যান গঘের চূড়ান্ত সৃজনশীল সত্ত্বার ঝলক দেখে, যা সব প্রচলিত ধারাকে ভেঙ্গে চুরে, উপেক্ষা করে ছবিকে এক নতুন মাত্রায় উত্তরণ ঘটায়। কিন্তু ট্র্যাডিশন বা চিরকালীন যাকিছু,তাকে কি সত্যিই উপেক্ষা করেছিলেন এঁরা? হয়তো এমনভাবে সরলীকরণ করা যাবে না বিষয়টা। 
গ্রেট আর্টিস্ট যারা, তাদের ক্রিয়েটিভ কাজের পাশাপাশি সবসময়ই চালিয়ে যেতে হয় চিরকালীন সৃষ্টির অনুকরণ,এতে তার কবজির জোর তো বাড়ে নির্ঘাৎ, তদুপরি একই ছবি,একই কম্পোজিশন ভিন্ন ভিন্ন হাতে পড়ে হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ নতুন ছবি। তাঁরা দক্ষ চাক্ষিক, কম্পোজিশন অনুকরণ বা অনুসরণ করলেও রঙের প্রয়োগ,ব্রাশের চলন সেই ছবিকে নিয়ে আসে তাঁর ঘরানার। এভাবে ছবির নবজন্ম হয়।

ভিনসেন্ট তাঁর সৃষ্টি-আয়ুষ্কালে বেশ কিছু অন্যের ছবির কপি করেছেন, তারমধ্যে জাপানি উডকাট ছবির প্রিন্টের মোহে পড়েছিলেন কিছুকাল,পড়ারই কথা, যেকোনো সংবেদনশীল শিল্পীর মনেই মায়া জাগায় মোলায়েম রঙের প্রলেপ,দৃঢ় রেখার চলন। ১৮৮৭ সাল অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষদিকে এবং তার ছবিজীবনের চরম উৎকর্ষের মুহূর্তে ভিনসেন্ট তিনটি জাপানি উডকাট প্রিন্টের অনুকরণ করেন,এই ধারার ছবির প্রতি তাঁর আকর্ষণ বরাবরই ছিল যথেষ্ট, এবং বেশকিছু প্রিন্ট তিনি সংগ্রহও করেছিলেন।
 সেই সময়কালে যে তিনটি ছবি ভিনসেন্ট অনুকরণ করেছিলেন, তারমধ্যে দুটি ছবির শিল্পী Utagawa Hiroshige এবং অপর ছবির শিল্পী Kesai Eisen, ছবিগুলি সবই উডকাট পদ্ধতিতে আঁকা, ভিনসেন্ট এই ছবিগুলির প্রিন্ট দেখেই অনুকরণ করেন। শুধুমাত্র 'Courtesan' শীর্ষক ছবিটি তিনি পান 'Paris illustré' ম্যাগাজিনের কভারে,এটি ১৮৮৬ সালে ছাপা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই ভিনসেন্ট মূল ছবির ড্রয়িং, কম্পোজিশন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এবং এনলার্জ অর্থাৎ সমানুপাতিক হারে বড়ো করার জন্য প্রথমেই গ্রিডলাইন ব্যবহার করে ড্রয়িং এর লেআউট করে নিয়েছেন।

যেমন এই ছবিটির ক্ষেত্রে মূল ছবিটি ছিল ২৫.৪ সেমি x ৩৭ সেমি মাপের,১৮৫৭ সালে Utagawa Hiroshige এর আঁকা 'Plum garden in Kameido' , জাপানি কাগজের ওপর রঙিন উডকাট প্রিন্ট। ভ্যান গঘ যখন ১৮৮৭ সালের অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি আঁকলেন ক্যানভাসে তেলরঙ দিয়ে।
প্রথমেই সেটিকে পেন্সিল,কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং করে নিলেন হাত মকশো করার জন্য , গ্রিড ড্রয়িংয়ের সুবিধা নিয়ে আকারেও বাড়ালেন ছবিটি, তাঁর ছবির আকার দাঁড়ালো ৫৫.৬ সেমি x ৪৬.৮ সেমি, যখন নিজের ছবিতে প্রবেশ করলেন,শিল্পবোধ থেকে ছবিটির উত্তরণ ঘটালেন,মূল ছবিতে গাছের কাণ্ডর রঙ ছিল কালো ও ধূষর,ভ্যান গঘের ছবিতে সেগুলি হলো লাল ও নীল। ছবির রঙ হলো অনেক উজ্জ্বল। ছবির বাইরের দিকে যোগ করলেন কমলা রঙের মোটা সীমান্তরেখা,তার ওপর অন্য জাপানি ছবি দেখে প্রথাগত ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার করলেন,ফলে ছবিটির রূপ বদলে গেল, নতুন একটি ছবির জন্ম হলো এভাবেই।

আবার এই ছবিটির কথায় আসা যাক, ছবিটির শিরোনাম 'Bridge in the rain' এটিও Utagawa Hiroshige এর আঁকা। ভিনসেন্ট ঐ একই সময়ে অর্থাৎ ১৮৮৭র অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি কপি করছেন, আগের ছবিটির মতো একইভাবে ছবির রেফারেন্স থেকে মূল কম্পোজিশন নিয়ে রঙ ও রেখার ক্ষেত্রে বদলে নিচ্ছেন চলন। ছবির চারপাশে ঘন সবুজ রঙের সীমান্ত রেখা দিয়ে ঘিরে দিচ্ছেন এবং জাপানি অক্ষরশিল্পকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করছেন। ভিনসেন্টীয় মেজাজ অনুযায়ী রেখা অনেক ঋজু ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এইসব ছবিতে, রঙের প্রয়োগও নিজস্ব ঘরানায়, উজ্জ্বল - ঝলমলে।

তৃতীয় ছবি অর্থাৎ Kesai Eisen এর উডকাট ছবি 'Courtesan' এর অনুকরণচিত্রটি ভ্যান গঘ আঁকছেন প্রথমে পেন্সিল, কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং হিসেবে কাগজে, তারপর মূল ছবিটি আঁকছেন ১০০.৭ সেমি x ৬০.৭ সেমি মাপের,কাপড়ের ওপর তেলরঙে।ছবিতে যে চরিত্রটি রয়েছে,সে একজন রাজ পরিবারের প্রতিনিধি, মেয়েটির চুলের ধরণ ও পোশাক এবং বেল্ট দেখে সেটা অনুমেয়,বেল্টটি ভিনসেন্ট দেখিয়েছেন কিমোনোর সামনের দিকে। এই ছবিতে ভিনসেন্ট আরেকটু এগিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন ছবির পশ্চাদপট নিয়ে, সেখানে একটি ভিন্ন ছবির খণ্ড খণ্ড অংশ দেখা যাচ্ছে। একটি ছোট জলাশয়, সেখানে জলপদ্ম ও জলজ উদ্ভিদের রাশি, বক বা সারস জাতীয় পাখি, বাঁশগাছের কাণ্ড ও পাতা,বাঙ প্রভৃতি দিয়ে সাজানো নিটোল আরেকটি কম্পোজিশন,এটিও জাপানি ছবির ধারা থেকেই নেওয়া, শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন।

এভাবেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সর্বকালের সেরা একজন শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও নিরন্তর ভাঙ্গাগড়ার খেলা চালিয়েছেন নিজের মধ্যে, ছাত্রের মতো নিবিড় অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন অতীত ঐশ্বর্যকে, তার থেকে প্রেরণা নিয়ে সৃষ্টি করেছেন নিজের শিল্প। ক্রমাগত গ্রহণ-বর্জন,পরিশীলন ও সংযুক্তিকরণের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে করে তুলেছেন আরো ধারালো, অভিজ্ঞ ও খোলা মানে শিল্পী হিসেবে।

তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: ভ্যান গঘ মিউজিয়াম 

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২

ফ্রিডা কাহলো : জীবন যন্ত্রণার শিল্পী

শিল্পী ফ্রিডা কাহলো –বোধহয় পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক চর্চিত নারীশিল্পী। মেক্সিকান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রথিতযশা শিল্পী হলেন ফ্রিডা কাহলো। ফ্রিডার জন্ম এই মেক্সিকোতেই, ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই জুলাই।যে বাড়িটিতে এখন 'ফ্রিডা কাহলো মিউজিয়াম',যে বাড়িটির ডাকনাম 'The Blue House', সেখানেই ফ্রিডার জন্ম ও জীবনের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত করা এবং তার জীবনের শেষ দিনগুলিও এখানেই কেটেছে।
ফ্রিডার ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে তার জীবন যন্ত্রণা,শৈশবের পোলিও রোগে আংশিক পঙ্গুত্ব বা ১৯২৫এর সেই পথ দুর্ঘটনা, যার অভিশাপ তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে বাকী জীবন। হয়তো একধরণের মানসিক-শারীরিক বিপন্নতা তাকে আশ্রয় করেছিল সারাজীবন,তাই তার ছবিতে বিপন্নতা এবং ফ্যান্টাসিকে আশ্রয় করে বিপন্নতা থেকে উত্তরণের রূপ খুব স্পষ্ট।
দিয়েগোর কাছে বারবার ফিরে যাওয়া এবং বিচ্ছেদ,সন্তানলাভের তীব্র ইচ্ছে কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা,বারংবার ঘরের টান এবং এক দ্বৈতসত্ত্বার টানে জেরবার ও ধ্বস্ত, একইসঙ্গে  বহুগামীতা ও সমকামীতাও ফিরে ফিরে এসেছে তার জীবনে,কখনো দিয়েগো রিভেরার প্রভাব তাকে উৎসাহ দিয়েছে আবার কি এক অস্থিরতার টানে নিজেকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছেন,নিজেকেই নিজে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজেকে খুঁড়ে তুলে এনেছেন ছবির বিষয় স্যুররিয়ালিস্ট ফর্মে,নিজের একঘেয়ে খণ্ডজীবন,অনেক চাওয়া এবং না পাওয়ার বিষযন্ত্রণা।একদা নিজের অবসাদ থেকে যে শিল্পের জন্ম তাই তাকে অমর করেছে, মানুষ আসলে দুঃখ-বিষাদ ভালোবাসে।ফ্রিডার প্রিয় সেই বিষাদময় নীলবাড়ি এখন তার নামাঙ্কিত মিউজিয়াম,যেখানে তার সব ছবি জুড়ে আজও আলোছায়া খেলা করে,একাধারে আনন্দ-বিষাদের আবাস,আজও আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করায় তার সেইসব অধিবাস্তববাদী ছবি যা মূলত আত্মজৈবনিক।ফ্রিডার ছবির চরিত্র হিসেবে বারংবার ফিরে এসেছেন শিল্পী নিজেই, তাঁর বহু ছবিই আসলে আত্ম প্রতিকৃতি, এবং এখানে শিল্পী সৎ,তার উপস্থাপনের আঙ্গিক রূপকধর্মী ও কল্পনাপ্রবণ হলেও ছবির মনস্তত্ত্ব সমসময়কে,তার জীবনের টানাপোড়েন কে যথাযথভাবে ব্যক্ত করে।ফ্রয়েড এর মনস্তাত্ত্বিক লেখা পড়ে ছবিতে নিজের জীবনের প্রতিস্থাপন ঘটাতে তাঁর হয়তো কিছুটা সহজবোধ হয়েছিল। জীবনের যেকোনো ঘটনাকেই তাই শিল্পে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। যেমন তাঁর 'Two fridas' ছবিতে তাঁর দ্বৈত উপস্থিতি,হাতে হাত রেখে,একজন ঐতিহ্যের অনুসারী,অপর জন আধুনিকা,ডিয়েগো রিভেরার সঙ্গে বিচ্ছেদের অব্যবহিত পরেই ভগ্নহৃদয়ে এই চিত্র রচনা, তাঁর মানসিক টানাপোড়েন,আত্ম-দ্বন্দ্ব এই ছবিতে স্পষ্ট।
ফ্রিডার ছবিতে প্রায়শই দেখা যায় ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত,যন্ত্রণাদগ্ধ। মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহও প্রায়শই দৃশ্যমান বা বাইরের জল-হাওয়ার পৃথিবীতে প্রকাশিত। মানসিক ও শারীরিক ভাঙ্গাচোরা জগতের মনস্তাত্ত্বিক দৃশ্যায়ন ফ্রিডার ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আরো কিছু কিছু বিষয় বা বস্তু তার ছবি জীবনে ফিরে ফিরে এসেছে বারবার, যেমন- চুল বাঁধার বাহারী ফিতে,মাথার চুল ও বিভিন্ন পোষা জীবজন্তু ও পাখি। বিধ্বস্ত জীবনকে গুছিয়ে বারবার সুন্দর করে বাঁধতে চেয়েছেন শিল্পী, কিন্তু তা বারবার গেছে ভেঙ্গে। মানুষের কাছ থেকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আশ্রয় খুঁজেছেন পশুপাখির কাছে, নিজের পঙ্গুত্ব যখন চূড়ান্ত হতাশ করেছে বা বাইরের আঘাত এসেছে, তখন ভেঙ্গে চুরমার করেছেন নিজেকে, নিজের ছবিকে।
সংক্ষিপ্ত ৪৭ বছরের জীবনে ফ্রিডা মাত্র একটি একক প্রদর্শনী করার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে, তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগের বছরে।
ফ্রিডার ছবি তাই জীবন যন্ত্রণার ছবি,অনেক না পাওয়া ইচ্ছের ছবি,আমাদের অবদমিত কামনা-বাসনার ছবি।তাই আজও দর্শক মিলিয়ে নেন নিজেকে ফ্রিডার ছবির সঙ্গে,যে যন্ত্রণা আমাদের স্তব্ধ করে তারাই ফ্রিডার ছবিতে সবাক হয়ে ফিরে ফিরে আসে।

তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: অন্তর্জাল

শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ: রূপদর্শী কথক

রবীন্দ্রনাথের কথায়,"অবন কিছু চায় না, জীবনে চায়নি কিছু। কিন্তু এই একটি লোক,যে শিল্পখাতে যুগপ্রবর্তন করেছে, দেশের সব রুচি বদলে দিয়েছে। তাই বলছি,একে যদি আজ দেশের লোক বাদ দেয় তবে সব বৃথা।"
 অবনীন্দ্রনাথ কে বা কী যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে হয়তো সহজ উত্তর হবে, অবনীন্দ্রনাথ আসলে একটি স্রোতের নাম,বহু বিচিত্র তার গতি, নতুন নতুন রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ আঁধার করে যার স্বচ্ছন্দ প্রবাহ এ খাত থেকে ও খাতে,ও খাতে থেকে সে খাতে। আধার বদলে গেলে যেমন দর্শন বদলে যায়,তেমনি অবনীন্দ্রনাথের ছবি বদলে গেছে গল্পবলায়,গল্পবলা বদলে গেছে কুটুম-কাটামে। এর আদিতে কিন্তু সেই একই সুর বয়ে চলেছে, শুধু স্বরলিপি বদলে বদলে যাচ্ছে আর ছটার মতো বিচ্ছুরণ হচ্ছে রঙ বেরঙের বাদশাহি আলো, রূপকথার সহজ মায়াজগত। 
খুব প্রবল সৃষ্টিধর মানুষের সৃষ্টির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদীর মতো নতুন খাত খুঁজে নেয়,যেমনটা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে.....কি যেন এক অরূপের সন্ধান চলে মনোজগতে,এক দণ্ডও তিষ্ঠোতে দেয়না - হয় লেখো,নয় রঙ তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসো,ছবি আঁকতে পারছো না তো পুতুল গড়ো,তাও পারছো না তো এসরাজখানা টেনে নিয়ে সুরের সন্ধান করো। অবনীন্দ্রনাথ এর বাহ্য চরিত্র কিন্তু এই অস্থিরতার আভাস মাত্র দেয়না, ধীরে বহমান এক প্রাচীন বাদশাহি মেজাজের অবয়বই ফুটে ওঠে। চঞ্চলমতি ময়ূরবাহন কার্তিকের পৃথিবী পরিক্রমা নয়, গজেন্দ্রগমনে গণেশের মাতৃ আবর্তন যার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যার স্বভাববিরুদ্ধ, প্রবৃত্তির অনুসরণই অধিক কাঙ্ক্ষিত। 'অন্তর বাজে তো যন্তর বাজে' এই হল অবনীন্দ্রনাথের খাঁটি মেজাজ।
আদিকালের শিল্পশাস্ত্র, ললিতকলা বিদ্যা, অলঙ্কারশাস্ত্র, মূর্তিশিল্প এসব বিষয়ে তাঁর নিবিড় অনুধ্যানের সন্ধান পাবেন তাঁর শিল্প রচনাগুলিতে,বিদ্যার্থীর তৃষ্ণায়  তিনি আত্মস্থ করেছেন প্রাচ্য কলাবিদ্যার রসভাণ্ডার,আর ভাণ্ডারী হয়ে তার উৎসমুখ খুলে দিয়েছেন সমকাল ও উত্তরকালের জন্য।
কিভাবে তাঁর ছবি ও লেখা সমতলীয়? বিশ্বজোড়া অবাঙমানসগোচর রূপজগত অবনীন্দ্রনাথের রেখার, ভাষার, সুরের,অবয়বের তর্জমায় অপ্রত্যক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় ছবি দেখছি চোখের সামনে বায়োস্কোপ এর মতো, তাঁর ছবি দেখলে মনে হয়,এর আড়ালে হয়তোবা একটি গল্প আছে, কুটুম কাটামের আবডালে আছে একটি কাঁচা মিঠে ।
অবনীন্দ্রনাথ বলছেন  "ছবিতে পরিপূর্ণতা এসে গেলেই মাটি। ছবিতে সব সময়েই কিছু চাইবে- আরো দাও,আরো চাই। শিল্পী অনবরত সেই দেবার চেষ্টা করে যাবে।সব দেওয়া হয়ে গেলে আর রইলো কী?" তাই যেখানে তাঁর মনে হয়েছে বড়ো সহজ হয়ে গেল যাতায়াত,সেখানেই তিনি বাঁক বদল করেছেন,তুলির বদলে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম,কলমের বদলে শেকড়-বাকড়,কাঠকুটো,ফেলাছড়া জিনিস। তাই হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময় 'কুটুম-কাটাম'। আসলে বারবারই তাঁর ভাবনায় ছিল এই তত্ত্ব, শিল্পী শুধু ছবিই আঁকবে কেন?তার সৃষ্টি যেদিকে যে রূপে ফুটে উঠবে সেইদিকেই সে যাবে। তাই তিনি যখন ইতিহাস আশ্রিত রাজকাহিনী লিখছেন,আমরা পড়ছি সরস পাঠের আনন্দে,সরল গল্পের আকর্ষণে।পড়তে পড়তে নিজের মতো দৃশ্যপট আঁকা হয়ে যায় মনে। এইজন্যই শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঋণী শাব্দিক অবনীন্দ্রনাথের কাছে, আবার উল্টোটাও।
শিল্পাচার্য এবং চিত্রশিল্পী  হিসেবে তিনি প্রাচীন শিল্পশাস্ত্র ও প্রাচ্য শিল্পের মসৃণ মেল ঘটিয়ে রূপসন্ধান করে একটি দেশীয় শিল্পের কাঠামো তৈরি করে দিয়ে গেছেন। প্রবল প্রতাপ বহিরঙ্গে মডার্ন ইউরোপীয় আর্ট থেকে অন্তঃরূপময় ইন্ডিয়ান আর্টের পৃথক সরণী তৈরি করে দেওয়া বড়ো কম কথা নয়। অভিভাবকের মতো হাতে ধরে অবনীন্দ্রনাথ রাস্তা দেখিয়ে গেছেন কিভাবে পুরাণ,মহাকাব্য, লোকগাঁথা,ব্রত, লৌকিক আচার থেকে দেশীয় শিল্পের রাস্তা তৈরি হতে পারে, শুধু দেখানোই নয়,আদি ভারতীয় রূপকলাশাস্ত্রের আঙ্গিক ও প্রকরণ কিভাবে সমকালীন এবং ভারতীয় ভাব ও দর্শনের অনুসারী হতে পারে,সেই মার্গদর্শনও তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে উঠেছিল। 
শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ তাই শুধু একজন শিল্পী নন, শিল্প শিক্ষক,শিল্পগুরু,কথক,ভাবচিন্তক,রূপদ্রষ্টা।যিনি তাঁর দক্ষিণের বারান্দায় বসে পড়ন্ত বিকেলের রোদে অনন্ত রূপদর্শী, অনন্ত কাহিনীকার, অনন্ত স্রষ্টা।
(চিত্র ও তথ্যঋণ: অন্তর্জাল)

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ও মৃত্যুশিল্প

২৭শে জুলাই ১৮৯০,ফ্রান্সের অউভার্স এর নিকটবর্তী শষ্যক্ষেত,একটি রিভলবার এর মুখোমুখি একজন ধ্বস্ত, বিষাদগ্রস্ত শিল্পী, চূড়ান্ত ব্যর্থ তাঁর জীবন,হয়তো নিজের প্রতি তাঁর যা প্রত্যাশা,তা পূরণেও ব্যর্থ।ভাই থিওকে লেখা শেষ চিঠিতেও নিজের জীবন যে সর্বৈবরূপে ব্যর্থ ও চূড়ান্ত টালমাটাল,তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।২৯শে জুলাই,১৮৯০ চিরদিনের মতো বিশ্রাম নিলেন শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।
১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এই এক দশক মূলত তাঁর শিল্পজীবন, অর্থাৎ তাঁর অতিসক্রিয় থাকার পর্যায়।অথচ এই স্বল্প সময়েই তাঁর সৃষ্টি প্রায় ৯০০র কাছাকাছি...... অতিমানবিক নয় কি? এই কঠোর পরিশ্রম একজন শিল্পীর মধ্যে নিজের কাজ সম্পর্কে যে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস তৈরি করে,তা নিশ্চয়ই ভিনসেন্টের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু এর বিপ্রতীপে থাকে শিল্পীর গ্রহনযোগ্যতা,যা তার উদ্যম ও আত্মবিশ্বাসকে আশ্রয় দেয়, এখানে এসেই বারবার ধাক্কা খাচ্ছেন ভিনসেন্ট, তাঁর গ্রহনযোগ্যতা প্রায় শূন্য। প্রেম নেই,অর্থ নেই,কাছের মানুষ নেই, ছবির সমঝদার নেই....এই অবসাদও নিশ্চয়ই কাজ করেছিল তাঁর মৃত্যুকালীন মনস্তত্ত্বে।
একজন শিল্পী হিসেবে ব্যর্থ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও ব্যর্থ, জীবন তাঁর জন্য কিছুই থালায় সাজিয়ে পরিবেশন করেনি, পরিবেশন করেছিল একটি ৭ মিলিমিটার Lefaucheux রিভলবার এবং মৃত্যু।
ভিনসেন্টের জীবনের শেষ ১২ ঘন্টা তাঁর সাথেই ছিলেন থিয়ো ভ্যান গঘ, যেভাবে তাঁর জীবনের পাশে পাশেই ছিলেন থিয়ো, সেভাবেই মৃত্যুর পাশেও দাঁড়ালেন,কান পেতে শুনলেন শিল্পীর স্বগতোক্তি,"এভাবেই চলে যেতে চেয়েছিলাম আমি", যে শান্তির খোঁজ পাননি জীবনভর,মৃত্যুই হয়তো সেই শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছিল শিল্পীর বুকে,বুলেটের ছদ্মবেশে।
মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা ভিনসেন্টের কাছে নতুন নয়,১৮৮৯ তেও ভাই থিয়োকে লেখা চিঠিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর ইঙ্গিত দেন, কিছুদিন পর রঙ ও তার্পিন তেল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। সেবার Dr. Theophile তাঁকে প্রাণে বাঁচান এবং তাঁর আত্মহত্যাপ্রবণতারও সাময়িক বিরতি ঘটান, কিন্তু সেই পুরনো মৃত্যুর ঘ্রাণ ফিরে আসে ১৮৯০এ, অ্যাসাইলাম থেকে ফিরেও ঝিমঝিম অবসাদ তাঁর পিছু ছাড়েনা।
তাঁর শেষ ছবিও যেন তাঁরই বিদায়ের দৃশ্যপট রচনা করে। পাকা গমক্ষেতের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিগন্তের দিকে, জীবনের দেশের প্রান্তসীমা থেকে মৃত্যুর সীমান্তে, একটা হ্যামারের মৃদুশব্দ,গুলির জোরালো আওয়াজ, বারুদের ভারি মৃত্যুগন্ধ, একঝাঁক কাক উড়ে গেল অবসাদময় একটি জীবনকে সাথে নিয়ে মৃত্যুর অনির্বচনীয় দেশে।


মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

ফ্রিডা কাহলো: ইচ্ছেশক্তির উদযাপন

জীবন যদি আপনাকে বারবার ধাক্কা মেরে অন্ধ খাদে ফেলে দেয়, আপনি কি অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে হাহাকার করবেন,নাকি প্রবল আত্মশক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাবেন জীবনকে?ইচ্ছেশক্তি আর অদম্য জীবন যে কী অসাধ্যসাধন করতে পারে তার সেরা নজির শিল্পী ফ্রিডা কাহলোর জীবন।
ফ্রিডা কাহলো –বোধহয় পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক চর্চিত নারীশিল্পী,যার শিল্পচর্চার সাথেসাথে জীবনচর্চাও বহুল আলোচিত।আসলে এটা বোধহয় একটা স্বাভাবিক প্রবণতা,আমরা শিল্পীর শিল্পচর্চার হালহকিকত সন্ধান না করে তার ব্যক্তিজীবনে উঁকি মারতেই বেশি পছন্দ করি,তাকে ঘিরে সত্য-মিথ্যার বলয় রচনা করি।লিওনার্দো,ভ্যান গঘ,পিকাসো বা অমৃতা শেরগিল....এরা সমকালের বা উত্তরকালের পাপারাৎজি ভক্তদের শিকার,
ফ্রিডাও এর ব্যতিক্রম নয়।
দর্শক তার ছবির মনস্তত্ত্ব,গঠনশৈলী বা অন্তর্লীন দর্শন নিয়ে যতোটা না আলোচনা করেন,তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেন তাঁর সংসারজীবনের ভাঙাগড়া,বহু সম্পর্ক,যৌনতা,দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে।
মেক্সিকোর অন্যতম সেরা মহিলাশিল্পী হিসাবে বিবেচিত, ফ্রিদা কাহলো  ১৯০৭ সালের ৬ই জুলাই মেক্সিকো সিটির কোয়োকোনে জন্মগ্রহণ করেন, আর পাঁচজন শিশুর মতো ফ্রিডারও শৈশবে স্বাস্থ্য খারাপ ছিল না, কিন্তু সে  ৬ বছর বয়সে পোলিও সংক্রমণের শিকার হন এবং নয় মাস ধরে তাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়। এই রোগের ফলে তার ডান পা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডান পা তার বাঁ দিকের চেয়ে অনেক  দূর্বল হয়ে যায়। তিনি পোলিও থেকে সুস্থ হয়ে উঠার পরও বাকি জীবন এই  দূর্বলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এই দুর্বলতা ঢাকতে  সারাজীবন দীর্ঘ স্কার্ট পরেছেন।তার বাবা তাকে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য  নানারকম খেলাধুলা করতে উৎসাহ দেন। ফ্রিডা ফুটবল খেলা, সাঁতার  এমনকি কুস্তিও করেছিলেন, যা কোনও মহিলার পক্ষে সেই সময় খুব স্বাভাবিক ছিলোনা। এরজন্য ফ্রিডার জীবনে তার বাবার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিডা বেশ দেরীতেই স্কুলে ভর্তি হলেও তার সাহসী ও খোলামেলা স্বভাবের জন্য খুব সহজেই স্কুলে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা মেক্সিকোর ন্যাশনাল প্রিপারেটরি স্কুলে, এখানেই তার সঙ্গে ডিয়েগো রিভেরার প্রথম পরিচয়। রিভেরা তখন ওখানেই একটি মিউরাল রচনার কাজ করছিলেন। ফ্রিডা প্রায়শই তার কাজ দেখতে যেতেন, এবং বন্ধুদের বলতেন একদিন এই শিল্পীকেই তিনি বিয়ে করবেন। ১৯২২ শে ফ্রিডা তার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে একটি বাসে করে যাওয়ার সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন,ফলে তাঁর মেরুদণ্ড ও কোমরের নিচের অংশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্টিলের পাত বসানো হয়,যা তাকে আরো পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার অভিঘাত তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে। রেডক্রস হাসপাতালে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে বাড়িতে ফিরেও তাঁকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়,সারা শরীর জুড়ে থাকে প্লাস্টারের আবরন।এই চূড়ান্ত মনখারাপের সময়েই তাঁর ছবির কাছে যাওয়া,প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি নির্মাণ। এর স্বপক্ষে তাঁর যুক্তি ছিল,"I paint myself because I am often alone and I am the subject I know best". অবশ্য ফ্রিডার বাবা মাও তাকে খুবই উৎসাহ দেন ছবি আঁকতে,যাতে সে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।রঙ,তুলি এমনকি একটি বিশেষ ভাবে তৈরি ইজেল আনিয়ে দেন,যাতে সে বিছানায় শুয়েই ছবি আঁকতে পারে,১৯২৮ আবার ফ্রিডার সাথে রিভেরার দেখা হয়,ফ্রিডা ছবির বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে শুরু করেন, এভাবেই তাদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে।এর পরের বছরই তাঁরা বিয়ে করেন ফ্রিডার মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও।রিভেরার কাজের সূত্রেই তাঁরা ঘুরে বেড়াতে থাকেন দেশ বিদেশ। ১৯৩২ থেকে তাঁর ছবিতে নিজের জীবন,আত্মযন্ত্রণা ছবির উপাদান হিসেবে আসতে থাকে স্যুররিয়াল ফর্মে।তার শারীরিক অক্ষমতা,মা হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা অথচ শারীরিক কারণে বারবার গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু....এসব মানসিক যন্ত্রণা বেরিয়ে আসে ছবির অবয়বে। ইতিমধ্যে তাঁর দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরেছে, রিভেরার বহুসম্পর্কের জন্য অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে এসেছে,এর ওপর ফ্রিডার বোন ক্রিস্টিনার সাথে সম্পর্ক ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দেয়,ফ্রিডা নিজের যন্ত্রণার প্রকাশ হিসেবে নিজেহাতে নিজের চুল কেটে ফেলেন। বারবার আলাদা হয়ে গেলেও ফ্রিডা এবং রিভেরা ফিরেও এসেছেন এক জায়গায়।ফ্রিডার জীবনেও এসেছে বহুসম্পর্ক, যেমন লিও ট্রটস্কির সঙ্গে সাময়িক একটি সম্পর্ক। ১৯৩৮ এ স্যুররিয়ালিস্ট শিল্পী আন্দ্রে ব্রেঁত এর সঙ্গে ফ্রিডার সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্ব হয়।এখান থেকেই ফ্রিডা উপলব্ধি করেন যে তাঁর যাত্রাপথ আসলে স্যুররিয়াল পথে।ঐবছরই নিউইয়র্ক সিটি গ্যালারীতে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়, প্রদর্শনীটি সফল হয়, এবং বেশকিছু ছবি বিক্রিও হয়।এর পরের বছর আন্দ্রে ব্রেঁত এর সহযোগিতায় প্যারিসেও একটি প্রদর্শনী হয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় শাগাল,পিকাসো ও মন্দ্রিয়ান এর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে। আবার অন্যদিকে ১৯৩৯ এই রিভেরার সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি হয়, কিন্তু ১৯৪০ এ তাঁরা পুনরায় বিবাহ করেন। যদিও দুজনের মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়, তাঁরা থাকতেন আলাদা জায়গায়,কাজ করতেন আলাদা। ১৯৪১ এ মেক্সিকোর সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচজন বিখ্যাত মহিলার পোর্ট্রেট আঁকার কাজ পান, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও তাঁর বাবার মৃত্যুর জন্য কাজটি শেষ করে উঠতে পারেন না।১৯৪৪ থেকে ফ্রিডার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে,বারবার অস্ত্রোপচার, ওষুধ, চিকিৎসা ফ্রিডাকে মানসিকভাবে অসহিষ্ণু করে তোলে,তার ছাপ পড়ে ছবিতে, বিদ্ধস্ত-ভাঙ্গাচোরা শরীরের দেখা মেলে তাঁর এসময়ের কম্পোজিশনে,যেখানে অধিকাংশ ছবির সাবজেক্টই ফ্রিডা নিজে। ১৯৫০এ তাঁর ডানপায়ে গ্যাংগ্রিন দেখা দেয়, দীর্ঘ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর পায়ের কিছুটা অংশ কেটে বাদ দিতে হয়, কিন্তু  ১৯৫৪ এই ফ্রিডার অদম্য প্রাণশক্তি কে হারাতে পারেনি,এই অবস্থায়ও কাজ চালিয়ে গেছেন, এমনকি ১৯৫৩এ একক প্রদর্শনীও করেছেন মেক্সিকোয়, অ্যাম্বুলেন্সে করে গেছেন প্রর্দশনীতে। কোনো জরা-ব্যাধিই বোধহয় শিল্পীকে থামাতে পারেনা।
ফ্রিডার জীবনেও বারবার নেমে এসেছে ঝড়ঝাপটা, শারীরিক অক্ষমতা, মানসিক অবসাদ,এমনকি স্বেচ্ছামৃত্যুও চেয়েছেন বহুবার, কিন্তু কখনো কাজ থামাননি। এতো অসহায় অবস্থায়ও আত্মসমর্পণ করেননি পরিবেশের কাছে,যতোবার আঘাত এসেছে, ততোবার পাল্টা আক্রমণ করেছেন শিল্পের ভাষায়। রাজনৈতিক ভাবেও তৎপর হয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৫৪এ তার ৪৭ তম জন্মদিনের কিছুদিন পরেই ফ্রিডা তাঁর প্রিয় নীলবাড়ি ছেড়ে পাড়ি দেন এক অনন্ত স্যুররিয়াল দুনিয়ায়। ডাক্তারি ভাষায় তাঁর মৃত্যুর পোষাকি নাম pulmonary embolism হলেও কেউ কেউ স্বেচ্ছামৃত্যুর কথাও বলে থাকেন।
ফ্রিডা কাহলো এমন এক নাম,যা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না, বরং আরো বাড়তে থাকে। তাঁর প্রিয় নীল বাড়ি আজ তাঁরই মিউজিয়াম,সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অনুরাগী, লড়াই এবং প্রতিবাদের আরেক নাম ফ্রিডা,যে শিখিয়েছে, জীবন যতোই কাঁটা বিছিয়ে দিক চলার পথে,রক্তমাখা পায়ে ইচ্ছেশক্তির সফলভাবে উদযাপন করার নামই জীবন।

(তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ : অন্তর্জাল)