ঘটনা এক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তার যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ও এবিষয়ে শিল্পচর্চার জন্য নাৎসী 'গেস্টাপো' বাহিনীর হাতে অপমানিত ও লঞ্ছিত হন শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ,তার ছবির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ হয়, মিউজিয়াম থেকে তার সব ছবি সরিয়ে ফেলা হয় ও তাকে প্রুশিয়ার শিল্পবিদ্যালয় থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়। এর থেকেই বোঝা যায় তাঁর ছবির প্রভাব সম্পর্কে ,এতো বাধা সত্ত্বেও তাঁকে থামানো যায়নি।
ঘটনা দুই: গেরহার্ট হাউপ্টমান এর বিখাত নাটক ‘দ্য ওয়েভার্স’ , যেখানে সিলেসিয়ার বয়নশিল্পীদের জীবনযুদ্ধ,তাদের ওপর নেমে আসা উৎপীড়ন,তাদের ব্যর্থ হয়ে যাওয়া বিপ্লব -এসব ক্যোলউইজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে,তিনি রচনা করেন তিনটি লিথোগ্রাফ ও তিনটি এচিং এর একটি সিরিজ। প্রদর্শিত ও ভূয়সী প্রশংসার পর অপর জার্মান শিল্পী অ্যাডলফ মেনজেল যখন শিল্পীকে স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মান জানানোর সুপারিশ করেন তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় উইলিয়াম কাইজার মনোনয়ন বাতিল করে বলেন “একজন মহিলা শিল্পীকে স্বর্ণপদক দেওয়াটা বড়ো বেশি বাড়াবাড়ি,সম্মান-মেডেল এসব পুরুষের বুকেই শোভা পায়।’’ বলাবাহুল্য ক্যোলউইজ এর ওয়েভার্স সিরিজের কাজগুলি আজও সারা পৃথিবীর শিল্পদর্শক মাথায় করে রেখেছেন, তার কাছে তুচ্ছ সোনার মেডেল নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর।
ক্যাথে ক্যোলউইজ (১৮৬৭–১৯৪৫) জার্মান মহিলা এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী,জন্ম প্রুশিয়ায় ১৮৬৭ সালে, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ছেলেবেলা থেকেই শিল্পের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন, পরবর্তীকালে ১৪ বছর বয়সে শুরু হয় তার যথাযথ শিল্পশিক্ষা, তখন থেকেই ম্যাক্স ক্লিংগার এর কাজ দেখে এবং লেখা পড়ে তিনি বুঝতে পারেন ছবি আঁকিয়ে হওয়ার চেয়ে গ্রাফিক্স এবং ভাস্কর্য তাঁকে বেশি আকর্ষণ করছে। মাতৃকুলসূত্রে তিনি পেয়েছিলেন ধর্মীয় মন, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।তাই তাঁর কাজের মধ্যে উঠে এসেছে চিরকালীন বিত্তহীন মানুষের জীবন যন্ত্রণা,দৈনন্দিন নগরযাপন, সভ্যতার সমতলে যুদ্ধ,হিংসা, মৃত্যু। ছোট থেকেই মৃত্যু দেখেছেন বারবার,জন্মসুত্রে জার্মানীর মানুষ হওয়ায় ভয়ানকভাবে দেখেছেন দুটি বিশ্বযুদ্ধ,দ্বিতীয় যুদ্ধপূর্ব নাৎসী নিপীড়ন ও নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের সামনে সাম্যের বিপন্নতা,যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বস্ত সমাজ ও অর্থনীতি, যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে তাঁর সন্তানের প্রাণ, ভেঙ্গে দিয়েছে তার স্টুডিও ও বাড়ি, নষ্ট হয়ে যায় অজস্র শিল্পকর্ম। ছেলেবেলা থেকেই এতো প্রিয়জনের মৃত্যু দেখেছেন,ভাই-বোন এর মৃত্যু তাঁর মনে এক বিপন্নতার জন্ম দিয়েছিলো। পরবর্তীকালে যুদ্ধে সন্তানের ও পৌত্রের মৃত্যুরও সাক্ষী হতে হয়েছে। এতো মৃত্যু তার মনে এনে দিয়েছিলো, মানসিক বৈকল্য দীর্ঘ অবসাদ ও হ্যালুসিনেশন।তাই হয়তো তাঁর ছবি বাস্তববাদী হয়েও অন্য এক রূপকথার জগতের কথা বলে।তাঁর ছবি সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম যুদ্ধবিরোধী ছবি,দরিদ্রের জীবনযন্ত্রণার ছবি, ধনতান্ত্রিক নিপীড়নের আগ্রাসী মুখে প্রলেতারিয়েতের লড়াইয়ের ছবি,সর্বোপরি সন্তানহারা মায়ের এক চিরকালীন আর্তির ছবি।ক্যোলউইজ এর ছবির বিষয় সুন্দর নয়, অসুন্দরের মর্মবেদনা তাঁর ছবির মূলসুর। তাঁর ছবির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কম রঙের ব্যবহার বা বলা ভালো শুধুমাত্র সাদা ও কালো রঙের ব্যঞ্জনায় সমাজের প্রান্তিক মানুষ, চাষী, শ্রমিক, তাঁতী তাদের ভাঙাচোরা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের ছাপ রেখে গেছেন তাঁর চারকোলে আঁকা অবয়ব চিত্রে, এচিং-লিথোগ্রাফি-উডকাট এ, ভাস্কর্যে। ক্যোলউইজের অজস্র সাদাকালো ছবির মায়ায় আমরা খুঁজে পাই এক সন্তানহারা অসহায় মায়ের বেদনা,হাহাকার। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি, মা ও সন্তানকে ঘিরে বহু রচনা আমাদের মাথা নত করে একজন সভ্য মানুষ হিসাবে।এই হাহাকার বা বোবা কান্না বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাৎসী আগ্রাসন ও যুদ্ধের ভয়াবহতা আমাদের নির্বাক করে,কান্নাকে শব্দহীন করে দেয়, এছাড়া আর কীইবা করার থাকে একজন সাধারণ মানুষের? সভ্যতার সেই কীটক্লিষ্ট, যন্ত্রণাদগ্ধ প্রাণ ক্যোলউইজ আত্মস্থ করেছিলেন নিজের জীবন জুড়ে,সন্ধান করেছিলেন হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে সভ্যতার সংকট, রচনা করেছিলেন তার নির্ভান অবয়ব, মানবতার দলিল। সারাজীবন অজস্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁর ছবি স্থান পেয়েছে বিশিষ্ট মিউজিয়াম এ, প্রদর্শনীতে। প্রুশিয়ান একাডেমী অফ আর্টস এ শিল্পশিক্ষা দিয়েছেন প্রথম মহিলা শিক্ষক হিসেবে। বিশ্বের অন্য দেশে বসবাসের আমন্ত্রণ পেলেও হাজার অসুবিধা ও বাধা সত্ত্বেও কখনো ছেড়ে চলে যাননি তাঁর মাতৃভূমি। ২২ শে এপ্রিল ১৯৪৫,শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ এর জীবনাবসান হয়।
তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: অন্তর্জাল ও ক্যাথে ক্যোলউইজ মিউজিয়াম