রবীন্দ্রনাথের কথায়,"অবন কিছু চায় না, জীবনে চায়নি কিছু। কিন্তু এই একটি লোক,যে শিল্পখাতে যুগপ্রবর্তন করেছে, দেশের সব রুচি বদলে দিয়েছে। তাই বলছি,একে যদি আজ দেশের লোক বাদ দেয় তবে সব বৃথা।"
অবনীন্দ্রনাথ কে বা কী যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে হয়তো সহজ উত্তর হবে, অবনীন্দ্রনাথ আসলে একটি স্রোতের নাম,বহু বিচিত্র তার গতি, নতুন নতুন রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ আঁধার করে যার স্বচ্ছন্দ প্রবাহ এ খাত থেকে ও খাতে,ও খাতে থেকে সে খাতে। আধার বদলে গেলে যেমন দর্শন বদলে যায়,তেমনি অবনীন্দ্রনাথের ছবি বদলে গেছে গল্পবলায়,গল্পবলা বদলে গেছে কুটুম-কাটামে। এর আদিতে কিন্তু সেই একই সুর বয়ে চলেছে, শুধু স্বরলিপি বদলে বদলে যাচ্ছে আর ছটার মতো বিচ্ছুরণ হচ্ছে রঙ বেরঙের বাদশাহি আলো, রূপকথার সহজ মায়াজগত।
খুব প্রবল সৃষ্টিধর মানুষের সৃষ্টির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদীর মতো নতুন খাত খুঁজে নেয়,যেমনটা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে.....কি যেন এক অরূপের সন্ধান চলে মনোজগতে,এক দণ্ডও তিষ্ঠোতে দেয়না - হয় লেখো,নয় রঙ তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসো,ছবি আঁকতে পারছো না তো পুতুল গড়ো,তাও পারছো না তো এসরাজখানা টেনে নিয়ে সুরের সন্ধান করো। অবনীন্দ্রনাথ এর বাহ্য চরিত্র কিন্তু এই অস্থিরতার আভাস মাত্র দেয়না, ধীরে বহমান এক প্রাচীন বাদশাহি মেজাজের অবয়বই ফুটে ওঠে। চঞ্চলমতি ময়ূরবাহন কার্তিকের পৃথিবী পরিক্রমা নয়, গজেন্দ্রগমনে গণেশের মাতৃ আবর্তন যার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যার স্বভাববিরুদ্ধ, প্রবৃত্তির অনুসরণই অধিক কাঙ্ক্ষিত। 'অন্তর বাজে তো যন্তর বাজে' এই হল অবনীন্দ্রনাথের খাঁটি মেজাজ।
আদিকালের শিল্পশাস্ত্র, ললিতকলা বিদ্যা, অলঙ্কারশাস্ত্র, মূর্তিশিল্প এসব বিষয়ে তাঁর নিবিড় অনুধ্যানের সন্ধান পাবেন তাঁর শিল্প রচনাগুলিতে,বিদ্যার্থীর তৃষ্ণায় তিনি আত্মস্থ করেছেন প্রাচ্য কলাবিদ্যার রসভাণ্ডার,আর ভাণ্ডারী হয়ে তার উৎসমুখ খুলে দিয়েছেন সমকাল ও উত্তরকালের জন্য।
কিভাবে তাঁর ছবি ও লেখা সমতলীয়? বিশ্বজোড়া অবাঙমানসগোচর রূপজগত অবনীন্দ্রনাথের রেখার, ভাষার, সুরের,অবয়বের তর্জমায় অপ্রত্যক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় ছবি দেখছি চোখের সামনে বায়োস্কোপ এর মতো, তাঁর ছবি দেখলে মনে হয়,এর আড়ালে হয়তোবা একটি গল্প আছে, কুটুম কাটামের আবডালে আছে একটি কাঁচা মিঠে ।
অবনীন্দ্রনাথ বলছেন "ছবিতে পরিপূর্ণতা এসে গেলেই মাটি। ছবিতে সব সময়েই কিছু চাইবে- আরো দাও,আরো চাই। শিল্পী অনবরত সেই দেবার চেষ্টা করে যাবে।সব দেওয়া হয়ে গেলে আর রইলো কী?" তাই যেখানে তাঁর মনে হয়েছে বড়ো সহজ হয়ে গেল যাতায়াত,সেখানেই তিনি বাঁক বদল করেছেন,তুলির বদলে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম,কলমের বদলে শেকড়-বাকড়,কাঠকুটো,ফেলাছড়া জিনিস। তাই হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময় 'কুটুম-কাটাম'। আসলে বারবারই তাঁর ভাবনায় ছিল এই তত্ত্ব, শিল্পী শুধু ছবিই আঁকবে কেন?তার সৃষ্টি যেদিকে যে রূপে ফুটে উঠবে সেইদিকেই সে যাবে। তাই তিনি যখন ইতিহাস আশ্রিত রাজকাহিনী লিখছেন,আমরা পড়ছি সরস পাঠের আনন্দে,সরল গল্পের আকর্ষণে।পড়তে পড়তে নিজের মতো দৃশ্যপট আঁকা হয়ে যায় মনে। এইজন্যই শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঋণী শাব্দিক অবনীন্দ্রনাথের কাছে, আবার উল্টোটাও।
শিল্পাচার্য এবং চিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি প্রাচীন শিল্পশাস্ত্র ও প্রাচ্য শিল্পের মসৃণ মেল ঘটিয়ে রূপসন্ধান করে একটি দেশীয় শিল্পের কাঠামো তৈরি করে দিয়ে গেছেন। প্রবল প্রতাপ বহিরঙ্গে মডার্ন ইউরোপীয় আর্ট থেকে অন্তঃরূপময় ইন্ডিয়ান আর্টের পৃথক সরণী তৈরি করে দেওয়া বড়ো কম কথা নয়। অভিভাবকের মতো হাতে ধরে অবনীন্দ্রনাথ রাস্তা দেখিয়ে গেছেন কিভাবে পুরাণ,মহাকাব্য, লোকগাঁথা,ব্রত, লৌকিক আচার থেকে দেশীয় শিল্পের রাস্তা তৈরি হতে পারে, শুধু দেখানোই নয়,আদি ভারতীয় রূপকলাশাস্ত্রের আঙ্গিক ও প্রকরণ কিভাবে সমকালীন এবং ভারতীয় ভাব ও দর্শনের অনুসারী হতে পারে,সেই মার্গদর্শনও তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে উঠেছিল।
শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ তাই শুধু একজন শিল্পী নন, শিল্প শিক্ষক,শিল্পগুরু,কথক,ভাবচিন্তক,রূপদ্রষ্টা।যিনি তাঁর দক্ষিণের বারান্দায় বসে পড়ন্ত বিকেলের রোদে অনন্ত রূপদর্শী, অনন্ত কাহিনীকার, অনন্ত স্রষ্টা।
(চিত্র ও তথ্যঋণ: অন্তর্জাল)