বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ও মৃত্যুশিল্প

২৭শে জুলাই ১৮৯০,ফ্রান্সের অউভার্স এর নিকটবর্তী শষ্যক্ষেত,একটি রিভলবার এর মুখোমুখি একজন ধ্বস্ত, বিষাদগ্রস্ত শিল্পী, চূড়ান্ত ব্যর্থ তাঁর জীবন,হয়তো নিজের প্রতি তাঁর যা প্রত্যাশা,তা পূরণেও ব্যর্থ।ভাই থিওকে লেখা শেষ চিঠিতেও নিজের জীবন যে সর্বৈবরূপে ব্যর্থ ও চূড়ান্ত টালমাটাল,তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।২৯শে জুলাই,১৮৯০ চিরদিনের মতো বিশ্রাম নিলেন শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।
১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এই এক দশক মূলত তাঁর শিল্পজীবন, অর্থাৎ তাঁর অতিসক্রিয় থাকার পর্যায়।অথচ এই স্বল্প সময়েই তাঁর সৃষ্টি প্রায় ৯০০র কাছাকাছি...... অতিমানবিক নয় কি? এই কঠোর পরিশ্রম একজন শিল্পীর মধ্যে নিজের কাজ সম্পর্কে যে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস তৈরি করে,তা নিশ্চয়ই ভিনসেন্টের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু এর বিপ্রতীপে থাকে শিল্পীর গ্রহনযোগ্যতা,যা তার উদ্যম ও আত্মবিশ্বাসকে আশ্রয় দেয়, এখানে এসেই বারবার ধাক্কা খাচ্ছেন ভিনসেন্ট, তাঁর গ্রহনযোগ্যতা প্রায় শূন্য। প্রেম নেই,অর্থ নেই,কাছের মানুষ নেই, ছবির সমঝদার নেই....এই অবসাদও নিশ্চয়ই কাজ করেছিল তাঁর মৃত্যুকালীন মনস্তত্ত্বে।
একজন শিল্পী হিসেবে ব্যর্থ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও ব্যর্থ, জীবন তাঁর জন্য কিছুই থালায় সাজিয়ে পরিবেশন করেনি, পরিবেশন করেছিল একটি ৭ মিলিমিটার Lefaucheux রিভলবার এবং মৃত্যু।
ভিনসেন্টের জীবনের শেষ ১২ ঘন্টা তাঁর সাথেই ছিলেন থিয়ো ভ্যান গঘ, যেভাবে তাঁর জীবনের পাশে পাশেই ছিলেন থিয়ো, সেভাবেই মৃত্যুর পাশেও দাঁড়ালেন,কান পেতে শুনলেন শিল্পীর স্বগতোক্তি,"এভাবেই চলে যেতে চেয়েছিলাম আমি", যে শান্তির খোঁজ পাননি জীবনভর,মৃত্যুই হয়তো সেই শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছিল শিল্পীর বুকে,বুলেটের ছদ্মবেশে।
মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা ভিনসেন্টের কাছে নতুন নয়,১৮৮৯ তেও ভাই থিয়োকে লেখা চিঠিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর ইঙ্গিত দেন, কিছুদিন পর রঙ ও তার্পিন তেল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। সেবার Dr. Theophile তাঁকে প্রাণে বাঁচান এবং তাঁর আত্মহত্যাপ্রবণতারও সাময়িক বিরতি ঘটান, কিন্তু সেই পুরনো মৃত্যুর ঘ্রাণ ফিরে আসে ১৮৯০এ, অ্যাসাইলাম থেকে ফিরেও ঝিমঝিম অবসাদ তাঁর পিছু ছাড়েনা।
তাঁর শেষ ছবিও যেন তাঁরই বিদায়ের দৃশ্যপট রচনা করে। পাকা গমক্ষেতের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিগন্তের দিকে, জীবনের দেশের প্রান্তসীমা থেকে মৃত্যুর সীমান্তে, একটা হ্যামারের মৃদুশব্দ,গুলির জোরালো আওয়াজ, বারুদের ভারি মৃত্যুগন্ধ, একঝাঁক কাক উড়ে গেল অবসাদময় একটি জীবনকে সাথে নিয়ে মৃত্যুর অনির্বচনীয় দেশে।


মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

ফ্রিডা কাহলো: ইচ্ছেশক্তির উদযাপন

জীবন যদি আপনাকে বারবার ধাক্কা মেরে অন্ধ খাদে ফেলে দেয়, আপনি কি অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে হাহাকার করবেন,নাকি প্রবল আত্মশক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাবেন জীবনকে?ইচ্ছেশক্তি আর অদম্য জীবন যে কী অসাধ্যসাধন করতে পারে তার সেরা নজির শিল্পী ফ্রিডা কাহলোর জীবন।
ফ্রিডা কাহলো –বোধহয় পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক চর্চিত নারীশিল্পী,যার শিল্পচর্চার সাথেসাথে জীবনচর্চাও বহুল আলোচিত।আসলে এটা বোধহয় একটা স্বাভাবিক প্রবণতা,আমরা শিল্পীর শিল্পচর্চার হালহকিকত সন্ধান না করে তার ব্যক্তিজীবনে উঁকি মারতেই বেশি পছন্দ করি,তাকে ঘিরে সত্য-মিথ্যার বলয় রচনা করি।লিওনার্দো,ভ্যান গঘ,পিকাসো বা অমৃতা শেরগিল....এরা সমকালের বা উত্তরকালের পাপারাৎজি ভক্তদের শিকার,
ফ্রিডাও এর ব্যতিক্রম নয়।
দর্শক তার ছবির মনস্তত্ত্ব,গঠনশৈলী বা অন্তর্লীন দর্শন নিয়ে যতোটা না আলোচনা করেন,তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেন তাঁর সংসারজীবনের ভাঙাগড়া,বহু সম্পর্ক,যৌনতা,দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে।
মেক্সিকোর অন্যতম সেরা মহিলাশিল্পী হিসাবে বিবেচিত, ফ্রিদা কাহলো  ১৯০৭ সালের ৬ই জুলাই মেক্সিকো সিটির কোয়োকোনে জন্মগ্রহণ করেন, আর পাঁচজন শিশুর মতো ফ্রিডারও শৈশবে স্বাস্থ্য খারাপ ছিল না, কিন্তু সে  ৬ বছর বয়সে পোলিও সংক্রমণের শিকার হন এবং নয় মাস ধরে তাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়। এই রোগের ফলে তার ডান পা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডান পা তার বাঁ দিকের চেয়ে অনেক  দূর্বল হয়ে যায়। তিনি পোলিও থেকে সুস্থ হয়ে উঠার পরও বাকি জীবন এই  দূর্বলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এই দুর্বলতা ঢাকতে  সারাজীবন দীর্ঘ স্কার্ট পরেছেন।তার বাবা তাকে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য  নানারকম খেলাধুলা করতে উৎসাহ দেন। ফ্রিডা ফুটবল খেলা, সাঁতার  এমনকি কুস্তিও করেছিলেন, যা কোনও মহিলার পক্ষে সেই সময় খুব স্বাভাবিক ছিলোনা। এরজন্য ফ্রিডার জীবনে তার বাবার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রিডা বেশ দেরীতেই স্কুলে ভর্তি হলেও তার সাহসী ও খোলামেলা স্বভাবের জন্য খুব সহজেই স্কুলে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা মেক্সিকোর ন্যাশনাল প্রিপারেটরি স্কুলে, এখানেই তার সঙ্গে ডিয়েগো রিভেরার প্রথম পরিচয়। রিভেরা তখন ওখানেই একটি মিউরাল রচনার কাজ করছিলেন। ফ্রিডা প্রায়শই তার কাজ দেখতে যেতেন, এবং বন্ধুদের বলতেন একদিন এই শিল্পীকেই তিনি বিয়ে করবেন। ১৯২২ শে ফ্রিডা তার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে একটি বাসে করে যাওয়ার সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন,ফলে তাঁর মেরুদণ্ড ও কোমরের নিচের অংশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্টিলের পাত বসানো হয়,যা তাকে আরো পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার অভিঘাত তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে। রেডক্রস হাসপাতালে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে বাড়িতে ফিরেও তাঁকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়,সারা শরীর জুড়ে থাকে প্লাস্টারের আবরন।এই চূড়ান্ত মনখারাপের সময়েই তাঁর ছবির কাছে যাওয়া,প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি নির্মাণ। এর স্বপক্ষে তাঁর যুক্তি ছিল,"I paint myself because I am often alone and I am the subject I know best". অবশ্য ফ্রিডার বাবা মাও তাকে খুবই উৎসাহ দেন ছবি আঁকতে,যাতে সে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।রঙ,তুলি এমনকি একটি বিশেষ ভাবে তৈরি ইজেল আনিয়ে দেন,যাতে সে বিছানায় শুয়েই ছবি আঁকতে পারে,১৯২৮ আবার ফ্রিডার সাথে রিভেরার দেখা হয়,ফ্রিডা ছবির বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে শুরু করেন, এভাবেই তাদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে।এর পরের বছরই তাঁরা বিয়ে করেন ফ্রিডার মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও।রিভেরার কাজের সূত্রেই তাঁরা ঘুরে বেড়াতে থাকেন দেশ বিদেশ। ১৯৩২ থেকে তাঁর ছবিতে নিজের জীবন,আত্মযন্ত্রণা ছবির উপাদান হিসেবে আসতে থাকে স্যুররিয়াল ফর্মে।তার শারীরিক অক্ষমতা,মা হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা অথচ শারীরিক কারণে বারবার গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু....এসব মানসিক যন্ত্রণা বেরিয়ে আসে ছবির অবয়বে। ইতিমধ্যে তাঁর দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরেছে, রিভেরার বহুসম্পর্কের জন্য অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে এসেছে,এর ওপর ফ্রিডার বোন ক্রিস্টিনার সাথে সম্পর্ক ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দেয়,ফ্রিডা নিজের যন্ত্রণার প্রকাশ হিসেবে নিজেহাতে নিজের চুল কেটে ফেলেন। বারবার আলাদা হয়ে গেলেও ফ্রিডা এবং রিভেরা ফিরেও এসেছেন এক জায়গায়।ফ্রিডার জীবনেও এসেছে বহুসম্পর্ক, যেমন লিও ট্রটস্কির সঙ্গে সাময়িক একটি সম্পর্ক। ১৯৩৮ এ স্যুররিয়ালিস্ট শিল্পী আন্দ্রে ব্রেঁত এর সঙ্গে ফ্রিডার সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্ব হয়।এখান থেকেই ফ্রিডা উপলব্ধি করেন যে তাঁর যাত্রাপথ আসলে স্যুররিয়াল পথে।ঐবছরই নিউইয়র্ক সিটি গ্যালারীতে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়, প্রদর্শনীটি সফল হয়, এবং বেশকিছু ছবি বিক্রিও হয়।এর পরের বছর আন্দ্রে ব্রেঁত এর সহযোগিতায় প্যারিসেও একটি প্রদর্শনী হয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় শাগাল,পিকাসো ও মন্দ্রিয়ান এর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে। আবার অন্যদিকে ১৯৩৯ এই রিভেরার সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি হয়, কিন্তু ১৯৪০ এ তাঁরা পুনরায় বিবাহ করেন। যদিও দুজনের মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়, তাঁরা থাকতেন আলাদা জায়গায়,কাজ করতেন আলাদা। ১৯৪১ এ মেক্সিকোর সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচজন বিখ্যাত মহিলার পোর্ট্রেট আঁকার কাজ পান, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও তাঁর বাবার মৃত্যুর জন্য কাজটি শেষ করে উঠতে পারেন না।১৯৪৪ থেকে ফ্রিডার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে,বারবার অস্ত্রোপচার, ওষুধ, চিকিৎসা ফ্রিডাকে মানসিকভাবে অসহিষ্ণু করে তোলে,তার ছাপ পড়ে ছবিতে, বিদ্ধস্ত-ভাঙ্গাচোরা শরীরের দেখা মেলে তাঁর এসময়ের কম্পোজিশনে,যেখানে অধিকাংশ ছবির সাবজেক্টই ফ্রিডা নিজে। ১৯৫০এ তাঁর ডানপায়ে গ্যাংগ্রিন দেখা দেয়, দীর্ঘ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর পায়ের কিছুটা অংশ কেটে বাদ দিতে হয়, কিন্তু  ১৯৫৪ এই ফ্রিডার অদম্য প্রাণশক্তি কে হারাতে পারেনি,এই অবস্থায়ও কাজ চালিয়ে গেছেন, এমনকি ১৯৫৩এ একক প্রদর্শনীও করেছেন মেক্সিকোয়, অ্যাম্বুলেন্সে করে গেছেন প্রর্দশনীতে। কোনো জরা-ব্যাধিই বোধহয় শিল্পীকে থামাতে পারেনা।
ফ্রিডার জীবনেও বারবার নেমে এসেছে ঝড়ঝাপটা, শারীরিক অক্ষমতা, মানসিক অবসাদ,এমনকি স্বেচ্ছামৃত্যুও চেয়েছেন বহুবার, কিন্তু কখনো কাজ থামাননি। এতো অসহায় অবস্থায়ও আত্মসমর্পণ করেননি পরিবেশের কাছে,যতোবার আঘাত এসেছে, ততোবার পাল্টা আক্রমণ করেছেন শিল্পের ভাষায়। রাজনৈতিক ভাবেও তৎপর হয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৫৪এ তার ৪৭ তম জন্মদিনের কিছুদিন পরেই ফ্রিডা তাঁর প্রিয় নীলবাড়ি ছেড়ে পাড়ি দেন এক অনন্ত স্যুররিয়াল দুনিয়ায়। ডাক্তারি ভাষায় তাঁর মৃত্যুর পোষাকি নাম pulmonary embolism হলেও কেউ কেউ স্বেচ্ছামৃত্যুর কথাও বলে থাকেন।
ফ্রিডা কাহলো এমন এক নাম,যা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না, বরং আরো বাড়তে থাকে। তাঁর প্রিয় নীল বাড়ি আজ তাঁরই মিউজিয়াম,সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অনুরাগী, লড়াই এবং প্রতিবাদের আরেক নাম ফ্রিডা,যে শিখিয়েছে, জীবন যতোই কাঁটা বিছিয়ে দিক চলার পথে,রক্তমাখা পায়ে ইচ্ছেশক্তির সফলভাবে উদযাপন করার নামই জীবন।

(তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ : অন্তর্জাল)