রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠি - (৩)

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠি :
[এই চিঠিটি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তাঁর ভাই থিও ভ্যান গঘকে লেখেন ১৮৮১র ১২ই অক্টোবর,এটেন(Etten) থেকে। এটি ভাবানুবাদ,আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে কিছু ভিন্ন,আলোচ্য মূল চিঠির  অংশবিশেষ ও ছবিগুলি সঙ্গে দেওয়া হল]   

প্রিয় ভাই থিও,
পরিবারের সবাই আবার তোমাকে দীর্ঘ চিঠি লিখেছে,এই বড়োসড়ো চিঠিতে আমিও বা একটা ছোট্ট চিরকুট গুঁজে দেওয়ার লোভ ছাড়ি কেন?আশাকরি তুমি দিব্যি আছো,এবং শতকাজের মধ্যেও আধঘণ্টা সময় কাটছাঁট করে বের করে এই অভাগার চিঠির উত্তর দেবে।
এবার কাজের কথায় আসা যাক,তুমি হয়তো জানতে চাইবে আমি আজকাল কি রাজকার্য করছি,ভাইটি আমার,এসো নিজের পক্ষে কিছু সাফাই দেওয়া যাক।
প্রথমেই বলি,দুটো বড় স্কেচ করছি সারবাঁধা উইলো গাছের (Pollard willows) চক আর অল্প সেপিয়া রঙ দিয়ে,খানিকটা ঠিক এই নিচের খসড়ার মতো, তারপর আরেকটা খাড়াভাবে আঁকা ছবি,লিউসিয়েগ( Leurseweg) থেকে লিওরের( leur) দিকে চলে যাওয়া রাস্তার ছবি। শুনলে খুশি হবে দুটি মডেল পেয়েছি,মাটি খোঁড়ার শ্রমিক আর ঝুড়িবোনার কারিগর। আর একটা কথা,গত সপ্তাহে কাকার কাছ থেকে এক বাক্স রঙ উপহার পেয়েছি,আঃ!দিব্য,আপাতত এই দিয়েই চমৎকার কাজ শুরু করা যাবে।কি আনন্দই যে হচ্ছে!
আপাতত এরকম ধরণের কিছু জলরঙের ছবি করছি,নিচের ওই খসড়ার মতো।বিশেষ করে এখানে মডেলগুলিকে পেয়ে দিব্যি আমোদ হচ্ছে,এখন একটা ঘোড়া আর একটা গাধার সন্ধানে আছি,ওদেরও মডেল বানাবো।
আগে যে মোটা ইনগ্রেস কাগজের( Ingres paper) কথা বলেছিলাম,সেগুলো বিশেষ করে জলরঙের কাজ করার জন্যে বেশ উপযোগী,আর অন্য কাগজের তুলনায় বেশ সস্তাও বটে।এগুলো ভালো হলেও আমি আর মোটেও তাড়াহুড়ো করে গুচ্ছ কাগজ কিনছি না,কারণ হগ(Hague) থেকে যে কাগজগুলো কিনেছিলাম সেগুলো মোটেও ভালো নয়,একদম সাদাটে সাধারণ।
তাহলে নির্ঘাৎ বুঝতে পারছো বিস্তর খাটাখাটুনি করছি কাজ নিয়ে।
সেন্ট কাকা( Uncle Cent) আগামীকাল হগ (Hague) যাচ্ছেন এবং সম্ভবত উনি মভ (Anton Rudolf Mauve)এর সাথে কথা বলবেন যাতে আমি আবার ওঁর ওখানে গিয়ে কাজ দেখতে পারি।
এখন বিদায় দাও ভাই আমার,আজ অনেকদূর চলে গিয়েছিলাম কাজ করতে করতে,তাই বেশ ক্লান্তিবোধ করছি,কিন্তু আমার দুচার শব্দ ছাড়াই কোনো চিঠি তোমার কাছে চলে যাবে এটা মানতে পারলাম না,তাই এটুকু লিখলাম।
আশাকরি ঈশ্বর সব কাজে তোমার সহায় হবেন,দূর থেকে আন্তরিক করমর্দন পাঠালাম।

একান্তই তোমার, ভিনসেন্ট
ছবি ও তথ্য ঋণ: Van Gogh Museum

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠি - (২)

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ –এর চিঠিঃ
(এই চিঠিটি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ভাই থিও ভ্যান গঘকে লেখেন ১২ই এপ্রিল ১৮৮১তে ব্রাসেলস থেকে।এটি ভাবানুবাদ,আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে কিছু ভিন্ন।)

প্রিয় ভাই থিও,
বাবার কাছ থেকে জানলাম সামনের রোববার(ঈস্টারের দিন) তোমার এটেন(Etten) এর দিকে আসার সম্ভাবনা আছে,এবং বাবা আমাকেও যেতে লিখেছেন।আমার পক্ষেও ওইসময় থাকা সুবিধা হবে,তাই আমি আজই সেখানে যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে পড়ছি।
আশায় আছি,শীঘ্রই আমাদের মোলাকাত হবে,আর আমিও তার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে আছি,বিশেষত তা এইজন্যে যে সম্প্রতি আমি রাপার্ড( Anthon Van Rappard)এর তত্ত্বাবধানে দুটি ড্রয়িং করেছি, “বাতিওয়ালারা” (The Lamp Bearers) এবং “ভারবাহকেরা”  (The Bearers of the Burden)। এই ছবিগুলো নিয়ে কিভাবে এগোনো যায়, সে বিষয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করার জন্যে উন্মুখ হয়ে আছি। অবশ্য আমার কিছু মডেল চাই সত্ত্বর এই ছবিগুলো শেষ করতে হলে,আমার বিশ্বাস তাতে ছবি ভালোই উৎরে যাবে। ‘স্মিটন – টিলি’ (Burn Smeeton – Auguste Tilly) বা L’Illustration পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পাঠানোর মতো কিছু কম্পোজিশন জমা হওয়া দরকার।
তাহলে আমি আজই রওনা দিলাম,পৌঁছে তোমায় জানিয়ে দেবো, যাতে তুমি না আবার ব্রাসেলস এ এসে আমাকে খোঁজো। ইচ্ছে আছে এটেন(Etten) এর ঘাসবনের কিছু স্কেচ করার, সেই মতলবেই দিন কয়েক আগে গিয়ে হাজির হচ্ছি।
সুতরাং আমাদের দেখা হচ্ছেই,এসো সেই আনন্দে মনে মনে একবার করমর্দন করি।
ইতি
একান্তই তোমার, ভিনসেন্ট
(এই চিঠির সঙ্গে তোমাকে তিনটে খসড়া ছবি পাঠালাম,যদিও সেগুলো এখনো নড়বড়ে-এলোমেলো,কিন্তু আশাকরি এর থেকেই তুমি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারবে যে আমার কাজের ধারাবাহিক উন্নতি হচ্ছে। তবে ভাই এটা স্মরণে রেখো যে আমি মাত্র কিছুকাল হল ছবি আঁকতে শুরু করেছি,যদিও শিশুকালে টুকটাক ছবি এঁকেছি।এবারের শীতকালে মনস্থ করেছি নিজস্ব কম্পোজিশনগুলি আঁকা কিছুকাল স্থগিত রেখে ঠিকঠাক অ্যানাটমিকাল ড্রয়িং এর চর্চা করতেই হবে।)
পরিশিষ্ট : 
(*চিঠিতে উল্লেখিত ছবিগুলির মধ্যে কেবলমাত্র “ভারবাহকেরা”  (The Bearers of the Burden) এই ছবিটির সন্ধান পাওয়া যায়, সেটি এর সাথে সংযুক্ত করা হল।)
তথ্য ও চিত্রঋণ: ভ্যান গঘ মিউজিয়াম

মোনালিসা, পিকাসো ও একটি চুরির তদন্ত :

মোনালিসা, পিকাসো ও একটি চুরির তদন্ত :
...........................................................
“good artists borrow, great artists steal.” বিশ্ববরেণ্য শিল্পী পাবলো পিকাসো এই চুরি সংক্রান্ত উক্তিটি বাইরের মোটা দাগের চুরি নয়,বরং শিল্পের অন্তর্নিহিত চলন আত্মীকরণ প্রসঙ্গে বলেছিলেন,কিন্তু সত্যিই একবার চোর সাব্যস্ত না হলেও সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন পিকাসো; তাও আবার যে সে ছবি নয়,খোদ লিওনার্দোর মোনালিসা চুরির দায় আরেকটু হলেই পড়ছিল পিকাসোর ঘাড়ে।
১৯১১র ২২শে আগষ্ট,ল্যুভর থেকে চুরি গেলো মোনালিসা। ঢিলেঢালা নিরাপত্তা বেষ্টনীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে লক্ষ মানুষের চোখের মণি তুলে নিয়ে গেল চোর,খবর জানা গেল ২৪ ঘন্টা পরে,অর্থাৎ চুরি গিয়েছে আগেরদিনই।এর কিছুদিন আগেই মিউজিয়ামের এক কারুকাজ করা কফিনে লুকিয়ে থেকে রাত্রিবাস করে একজন ফরাসী সাংবাদিক প্রমাণ করে দিয়েছেন যে ল্যুভরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতোটা ঢিলেঢালা অপ্রস্তত,সেখান থেকে অনায়াসে যেকোনো শিল্পদ্রব্য নিয়ে নিশ্চিন্তে পিঠটান দেওয়া যায়।কারণ মাত্র ১৫০ জন নিরাপত্তারক্ষী পাহারা দেন আড়াই লক্ষ শিল্পদ্রব্যের। 

এমন হাই প্রোফাইল চুরির পর স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন পড়ে গেল,পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে শুরু করলো প্রতিটি ক্লু,দেশের সীমান্ত সীল করে দেওয়া হল যাতে অপহৃত দ্রব্য দেশের বাইরে যেতে না পারে। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে যায়, চুরির কিনারা হয়না। প্যারিস জার্নাল ঘোষণা করে মোনালিসা ফিরিয়ে দিলে দেওয়া হবে পঞ্চাশ হাজার ফ্রাঁ, এমন সময় Joseph Géry Pieret নামের এক ব্যক্তি পুরস্কারের লোভে সটান প্যারিস জার্নালের অফিসে ঢুকে জানালো যে সে কিছু তথ্য দিতে পারে, কেননা সে প্রায়শই এরকম মূল্যবান শিল্পদ্রব্য চুরি করে থাকে ল্যুভর থেকে, জেরায় জানা যায় এরকম আইবেরিয়ান দুটি মূর্তি সে বেচেছে জনৈক শিল্পীকে, ১০০ ফ্রাঁর বিনিময়ে.......আরো জানা যায় যে এই Pieret ছিল আগে সাহিত্যিক অ্যাপোলিনেয়র এর সেক্রেটারি, ব্যাস দুয়ে দুয়ে চার হতে থাকে অঙ্ক, বোঝা যায় যে ঐ “জনৈক শিল্পী” আসলে পিকাসোই, কারণ অ্যাপোলিনেয়রের অন্তরঙ্গ বন্ধু হলেন পিকাসো। ল্যুভরের স্ট্যাম্প মারা শিল্পদ্রব্য চোরাই জেনেও কিনেছেন পিকাসো, ফলে তাদের দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে তদন্ত হতে পারে, এই ভয়ে দুই বন্ধু একদিন পুরোনো স্যুটকেসে ভরে বাড়ি থেকে দূরে শ্যেন নদীতে ফেলে দিতে যান মূর্তিদুটি, পরে অবশ্য অ্যাপোলিনেয়র ফেরত দেন মূর্তিদুটি এবং পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। কোর্টে কেস ওঠে, কিন্তু কী আশ্চর্য! পিকাসো কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেন তিনি অ্যাপোলিনেয়রকে চেনেনই না, আরো বিস্তর জলঘোলা হওয়ার পর বিচারক বুঝতে পারেন, আর যাইহোক এদের সঙ্গে মোনালিসা চুরির কোনো সম্পর্ক নেই, ফলে জরিমানা দিয়ে রেহাই পান দুজনে।
এরও দুবছর বাদে,অর্থাৎ ১৯১৩ সালে খুঁজে পাওয়া যায় মোনালিসা,জানা যায় Vincenzo Peruggia নামে একজন ইতালিয়ান শিল্পী, যিনি ল্যুভরেই চাকরী করতেন, তিনিই সরিয়েছিলেন মোনালিসাকে। উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভূমি ইতালির সম্পদ মোনালিসাকে ইতালিতেই ফিরিয়ে দেওয়া।

চোর ধরার খবর পেয়ে সেদিন নিশ্চয়ই স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন পিকাসো!

শনিবার, ২৯ মে, ২০২১

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর: মায়াজগতের রূপকার

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মায়াজগতের রূপকার :

জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির শিল্প ঐতিহ্যের ধারায় এক স্বতন্ত্র নক্ষত্র গগন ঠাকুর। গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র গগনেন্দ্রনাথ,অবনীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা গগনেন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ....তবু যেন কিছুটা চর্চার আড়ালেই থেকে গেলেন তিনি।তার বহুমূখী প্রতিভা,সদা তৎপর এবং উৎসুক খোলা মন, বিশ্বের বিবিধ শিল্পধারায় নিরন্তর পরীক্ষা-নীরিক্ষা তাকে সমকালীন আর সকলের থেকে পৃথক করে তুলেছিল।
শুধু চিত্রশিল্পও নয়, নাট্যশিল্পেও তিনি সমান মনোযোগী,ঠাকুরবাড়ির নাট্যচর্চার অবিচ্ছেদ্য নাম।পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিন্তে তাঁর ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন নাটকের সামগ্রিক সজ্জার ভার,বা নিজের অভিনয় গুণেই প্রশংসা আদায় করে নিচ্ছেন সকলের।অন্যদিকে এই গগনেন্দ্রনাথই অনায়াসে লিখে ফেলছেন “ভোঁদর বাহাদুর”এর মতো অসাধারণ সাহিত্য।
রোদেনস্টাইন তাঁর স্মৃতিচারণায় গগনেন্দ্রনাথের সংবেদনশীল মনের উল্লেখ করছেন,বিশ্বশিল্পের নানা প্রকোষ্ঠে তার অবাধ বিচরণের কথাও বলছেন,আবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে আখ্যা দিচ্ছেন অভিনয়ের একজন ‘জাতশিল্পী’ হিসেবে।গগনেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬৭ তে,পিতা গুণেন্দ্রনাথের অকাল প্রয়াণ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে,তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আরেকটি বিষয়েও মিল,তিনিও কবির মতোই স্কুলছুট,প্রথাগত শিক্ষার নাগপাশ এড়িয়ে তৈরী করে নিয়েছেন স্বতন্ত্র স্ব-শিক্ষাধারা। জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে পরিবারের ও এস্টেটের দায়দায়িত্ব এসেছে তাঁর জীবনে,সাময়িক ভুলিয়ে দিয়েছে শিল্প-সাহিত্য-নাট্যচর্চা, আবার সেসব সামলে দীর্ঘদিন পরে হাতে তুলে নিয়েছেন প্রাণের আশ্রয় রঙ-তুলি।ততদিনে কণিষ্ঠ অবনীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন বাংলার শিল্পের অন্যতম মুখ।
প্রথাগত শিল্পশিক্ষা না থাকলেও গগন ঠাকুর দীর্ঘসময় জলরঙের নিবিড় শিক্ষা নিয়েছেন হরিনারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে,পরে প্রাচ্যের,বিশেষত জাপানী ধৌত পদ্ধতিও অনুশীলন করেছেন, জাপানি শিল্পী হিশিদা এবং টাইক্কান এর কাজের ধারার প্রভাব পড়েছে তাঁর ছবিতে।এই ধারার রূপ ধরা ছিল তাঁর করা রবীন্দ্রনাথের “জীবন স্মৃতি” গ্রন্থের মায়াময় অলঙ্করনে।জাপানী ঐতিহ্যবাহী ব্রাশ ও ইঙ্কের আত্মপ্রত্যয়ী চলন এইসব ছবির সম্পদ।
তাঁর ছবির মধ্যে  রঙের  মৃদু অথচ গভীর ব্যাঞ্জনাময় ব্যবহার,আলো-ছায়ার আশ্চর্য চলন, ব্যঞ্জনাময় টোনের ওঠাপড়া ও সুঠাম কম্পোজিশন আমাদের ছবির অন্তরাত্মার কাছে পৌঁছে দেয়।আমরা কখনোই ভুলতে পারবো না নদীতে প্রতিমা বিসর্জ্জন,বা আলো-আঁধারি লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিমাসহ শোভাযাত্রা বা পুরীর মন্দিরের দৃশ্য অথবা পাহাড়ে সূর্যোদয়,নদীনালা ঘেরা বাংলার নিসর্গচিত্র বা বর্ষার ধারাসিক্ত প্রকৃতি,বা বিখ্যাত শ্রীচৈতন্য সিরিজের কাজ.....সব ছবিতেই পেলব মনোমুগ্ধকর একটা ম্যাজিক দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
আবার ১৯১৬ নাগাদ তিনি বদলে ফেলছেন তাঁর দৃষ্টি, একজন প্রগতিশীল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন সামাজিক ত্রুটি বিচ্যূতি, তার দলিল রাখছেন নতুন ধারার ব্যঙ্গচিত্রে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাংলা কার্টুন, ক্যারিকেচার বা স্যাটায়ারধর্মী ছবির অন্যতম জনকও বলা যায় তাঁকে। তৎকালীন সময়ে তাঁর ব্যঙ্গচিত্রধারা অতি আলোচিত ও জনপ্রিয়ও হয়েছিল।আবার এই গগন ঠাকুরই কিউবিজম ঘরানা আত্মস্থ করে নিজর ছবিতে তার রূপ দিচ্ছেন,সমকালীন বিচারে তাও এক অভিনব বিষয়।অর্থাৎ বিবিধ ধারার প্রতি তাঁর আগ্রহ,অনুশীলন,চর্চা ও পড়াশোনা এবং পরিশেষে তার উপস্থাপন লক্ষ্যনীয়।তিনি প্রাচ্য ধারা থেকেও নিচ্ছেন আবার অনায়াসে প্রতীচ্যের কিউবিজম,ইমপ্রেশনিজম থেকেও নিচ্ছেন।  
তিনি ছবির প্রেক্ষাপটকে যেভাবে ভাঙছেন, সাজাচ্ছেন...পরিপ্রেক্ষিতের জ্ঞানকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে দুঃসাহসী নীরিক্ষা সম্পাদন করছেন,জ্যামিতিক আকারকে ছন্দবদ্ধভাবে নিয়ে আসছেন তাঁর কম্পোজিশনে বা যেভাবে স্বল্প রঙের প্যালেটকে অজস্র টোনে ভাগ করে দিচ্ছেন অথবা রেখার সংবেদন তৈরী করছেন –তা তাঁর ছবির প্রতি মনোযোগী করে তোলে আগ্রহী দর্শককে, আপনিই টেনে নিয়ে যায় রূপজগতের অন্তঃপুরে।
...........................................................
চিত্রও তথ্যঋণ -  অন্তর্জাল

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের কান: কিছু তথ্য কিছু মিথ

ভিনসেন্টের কানঃ কিছু তথ্য কিছু মিথ
…...................................................
১৮৮৮র ২৩শে ডিসেম্বর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ফ্রান্সের আর্লে বসবাসকালে স্বহস্তে নিজের বাঁদিকের কানের কিছুটা অংশ ক্ষুর দিয়ে কেটে ফেলেন এক প্রবল মানসিক উৎকণ্ঠা ও টানাপোড়েনের বশবর্তী হয়ে, এরপর কানের কাটা অংশটি উপহার দেন গ্যাব্রিয়েল নামের এক নিকটবর্তী যৌনপল্লীর পরিচারিকাকে, যাকে ভিনসেন্ট পছন্দ করতেন। কারো মতে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েই ভিনসেন্টের এই মনোবিকার, আবার কেউ বলেন বন্ধু পল গঁগ্যার সঙ্গে সংঘাতই এই ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কারণ যাইহোক কালক্রমে কিন্তু ঘটনাটি ভিনসেন্টের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে,ভিনসেন্ট নিজেই ঐ ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় নিজের প্রতিকৃতি ধরে রাখেন চিত্রপটে।পরবর্তীকালে ভিনসেন্ট গবেষকরা খোঁজার চেষ্টা করেছেন এই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও অভিঘাত। সম্প্রতি গবেষকদের মত বলছে ভিন্নকথা,যেসময়ের এই ঘটনাটি,ঠিক তার আগেই ভিনসেন্ট খবর পান তাঁর ভাই থিয়ো বিয়ে করতে চলেছে,এই খবরটিই ভিনসেন্টকে মানসিকভাবে বিচলিত করে তোলে,তাঁর শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের একমাত্র আশ্রয় ভাইটিকে হারানোর ভয়ে,এবং থিয়ো যে মাসিক ১০০ ফ্রাঁ খরচ যোগাতেন ভিনসেন্টকে,সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্কে ভিনসেন্টকে উন্মাদপ্রায় করে তোলে,তারই ফলশ্রুতিতে এই কাণ্ডটি ঘটিয়ে বসেন ভিনসেন্ট,আবার আরেকটি তত্ত্ব বলছে অত্যধিক মাত্রায় মদ্যপান করতেন ভিনসেন্ট,সেটি বন্ধ করে দেওয়াতেই মানসিক বিকার দেখা দেয় তাঁর।আগে প্রচলিত মত ছিল যে ভিনসেন্ট কেবলমাত্র কানের লতির একটি অংশ কেটেছিলেন,কিন্তু বর্তমানে তাঁর ডাক্তারের(ডাঃ ফেলিক্স রে) একটি প্রেসক্রিপশন প্রকাশ্যে এসেছে যেখানে ডাক্তার এঁকে দেখিয়েছেন যে শুধু লতি নয়,কানের একটা বড় অংশই কাটা গিয়েছিল।

ছবি ও তথ্যঋণঃ ভ্যান গঘ মিউজিয়ম ও অন্তর্জাল

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠি - ( ১)

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠি
.........................................
 [এই চিঠিটি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তার ভাই থিও ভ্যান গঘকে লেখেন ৫ই আগষ্ট,১৮৭৯ কিউসমেস থেকে।এটি ভাবানুবাদ,আক্ষরিক অনুবাদের কঠোর অনুশাসন থেকে কিছু ভিন্ন, সাহিত্যপাঠের আনন্দ যাতে ক্ষুন্ন না হয় সেইজন্য অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে]

প্রিয় ভাই আমার,

বেশ ব্যস্ততার মধ্যেই এই চিঠিটা লেখা চলছে।তুমি কি এরমধ্যে প্যারিস যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা এঁটেছো?যদি তাই হয় তবে তারিখ এবং সময়টি আমার কাছে ফাঁস করে দিয়ো,সম্ভাবনা আছে তোমার সাথে স্টেশনে মোলাকাত করার।তোমার যদি একদিন বা তারচাইতে কম বা তার চাইতে বেশি থাকবার ফুরসত হয়,জেনো আমার চাইতে সুখী আর কেউ হবেনা,কারণ তখন তোমাকে এখানকার কিছু ড্রয়িং দেখাতে পারবো।শুধুমাত্র এই ছবিগুলোর দর হাঁকিয়েই তোমাকে টেনে আনছি না,তা তুমি মালুম পাবে এখানকার নিসর্গ আর চারপাশের বিস্ময়কর দৃশ্যরাজির সামনে একা এসে দাঁড়ালে – হলপ করে বলছি আমার প্রতিবেশী ব্যক্তি বা বস্তু সবই ছবির মতো সুন্দর,আঁকার জন্যে লোভ জাগায়।

তুমি কি কখনো ডিকেন্সের (Charles Dickens) “Les Temps Difficiles”(Hard Times)‘হার্ড টাইমস’ পড়েছো? আমি বইয়ের নামটা ফরাসীতেই লিখলাম কারণ হ্যাচেট (Hachette) প্রকাশনার একটি ১.২৫ফ্রাঙ্ক দামের চমৎকার ফরাসী অনুবাদ আছে।এটা একখানা জবরদস্ত সৃষ্টি,লেখক এখানে স্টিফেন ব্ল্যাকপুল (Stephen Blackpool) নামের একজন খেটে খাওয়া মানুষের চরিত্রের চমৎকার ছবির মতো দরদী প্রতিকৃতি রচনা করেছেন জাদু কলম দিয়ে।

আমি এখন ব্রাসেলসএ নোঙ্গর,মারিয়া-হোরবেকে (Maria-Horebeke)(ব্রাসেলস এর নিকটবর্তী একটি ছোট গ্রাম)এবং তৌরনাই (Tournai)(ওয়েসমেস এর নিকটবর্তী একটি শহর)অঞ্চলে দিব্যি পায়ে হেঁটেই ঘোরাঘুরি করছি।

এই মুহুর্তে আছি এডওয়ার্ড জোসেফ ফ্রাঙ্ক (Edouard Joseph Francq) নামের এক ধর্মপ্রচারকের কিউসমেস (Cuesmes) এর ডেরায়।

সম্প্রতি এখানে বেশ বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে।

এসো প্রিয়তম ভাইটি আমার,ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ট্রেন আসার আগে পর্যন্ত এখানে কাটিয়ে যাও কিছু সময়।

সম্প্রতি আবার একটি স্টুডিওতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল,রেভারেণ্ড পিটারসন (Reverand Pieterszen) এর স্টুডিও এটি,উনি সেলফট  (Schelfhout) এবং হপেনব্রাওয়ার্স (Hoppenbrouwers)(দুজন বিশিষ্ট ডাচ চিত্রশিল্পী)এর ধারার অনুসারী এবং শিল্প সম্বন্ধেও ওনার জ্ঞান বেশ স্বচ্ছ।

উনি আমার ‘খনি শ্রমিক’দের নিয়ে করা একটি স্কেচ চেয়েছেন।এই স্কেচগুলি আমি প্রায়শই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে জেগে করে চলি কারণ না করে থাকতে পারিনা,এখানকার স্মৃতিচিন্হ ধরে রাখার চেষ্টা করছি আর সবচেয়ে বড়কথা এখানকার পরিস্থিতি যা আমার মনে গভীর ছাপ ফেলছে এবং দলিল না এঁকে থাকতে দিচ্ছে না।

কিন্তু বুড়ো ভাই আমার,মোটেও আর সময় নেই,মিঃ টার্সটিগকে  (Mr. Tersteeg) ধন্যবাদ জানাতে হবে ওঁর পাঠানো রঙের বাক্স এবং বড় স্কেচখাতাটার জন্য,কিন্তু দেখো কাণ্ড,ধন্যবাদ জানানোর আগেই আমি অর্ধেক খাতার পাতা এঁকে ভরিয়ে ফেলেছি।

এদিকের খবর জানো?আমি এক বুড়ো ঈহুদী বইওয়ালার কাছ থেকে আরেকটা ঢাউস ড্রয়িং খাতা কিনেছি,যাতে পুরোনো ওলন্দাজি পাতায় ভর্তি,চমৎকার ছবি আঁকা যাবে ওতে।

যদি তোমার সাথে দেখা হয়,কী খুশি যে হবো বলে বোঝাতে পারিনে,তোমাকে ডিকেন্সর ‘হার্ড টাইমস’ (Les temps difficiles) বইখানা দেবো যদি আসতে পারো; নচেৎ সময় সুযোগমতো তোমার কাছে পাঠিয়েও দিতে পারি।

বিদায় ভাই আমার,

মনে মনে প্রাণভরা করমর্দন গ্রহন করো আর আমার ওপর বিশ্বাসটুকু বজায় রেখো সর্বদা।

একান্ত তোমারই

ভিনসেন্ট

..............................................................
পরিচিতি:

·         Mr. Tarsteeg: ভ্যান গঘের বন্ধু এবং একজন আর্ট ডিলার

·         Charles Dickens:  ভিক্টোরিয়ান যুগের একজন সমাজ সচেতন ইংরেজ লেখক এবং সমালোচক

·         Reverend Pieterszen: একজন পাদরী এবং শিল্পী

·          Edouard Joseph Francz: কিউসমেস এর একজন ধর্মপ্রচারক

·         Schelfhout: একজন বিশিষ্ট ওলন্দাজ শিল্পী

·         Hoppenbrouwers: বিশিষ্ট শিল্পী এবং Schelfhout এর শিষ্য

 

তথ্য ঋণঃ ভ্যান গঘ মিউজিয়াম, আমস্টারডম(,নেদারল্যান্ড)
(শারদীয়া অবিন্যস্ত পত্রিকায় প্রকাশিত)

 

Show quoted text