শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩

ক্যাথে ক্যোলউইজ(Käthe Kollwitz)

শুরুতেই দুটি ঘটনার কথা জেনে নেওয়া যাক,
ঘটনা এক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তার যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ও এবিষয়ে শিল্পচর্চার জন্য নাৎসী 'গেস্টাপো' বাহিনীর হাতে অপমানিত ও লঞ্ছিত হন শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ,তার ছবির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ হয়, মিউজিয়াম থেকে তার সব ছবি সরিয়ে ফেলা হয় ও তাকে প্রুশিয়ার শিল্পবিদ্যালয় থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়। এর থেকেই বোঝা যায় তাঁর ছবির প্রভাব সম্পর্কে ,এতো বাধা সত্ত্বেও তাঁকে থামানো যায়নি।
ঘটনা দুই: গেরহার্ট হাউপ্টমান এর বিখাত নাটক ‘দ্য ওয়েভার্স’ , যেখানে সিলেসিয়ার বয়নশিল্পীদের জীবনযুদ্ধ,তাদের ওপর নেমে আসা উৎপীড়ন,তাদের ব্যর্থ হয়ে যাওয়া বিপ্লব -এসব ক্যোলউইজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে,তিনি রচনা করেন তিনটি লিথোগ্রাফ ও তিনটি এচিং এর একটি সিরিজ। প্রদর্শিত ও ভূয়সী প্রশংসার পর অপর জার্মান শিল্পী অ্যাডলফ মেনজেল যখন শিল্পীকে স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মান জানানোর সুপারিশ করেন তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় উইলিয়াম কাইজার মনোনয়ন বাতিল করে বলেন “একজন মহিলা শিল্পীকে স্বর্ণপদক দেওয়াটা বড়ো বেশি বাড়াবাড়ি,সম্মান-মেডেল এসব পুরুষের বুকেই শোভা পায়।’’ বলাবাহুল্য ক্যোলউইজ এর ওয়েভার্স সিরিজের কাজগুলি আজও সারা পৃথিবীর শিল্পদর্শক মাথায় করে রেখেছেন, তার কাছে তুচ্ছ সোনার মেডেল নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর।
ক্যাথে ক্যোলউইজ (১৮৬৭–১৯৪৫) জার্মান মহিলা এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী,জন্ম প্রুশিয়ায় ১৮৬৭ সালে, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ছেলেবেলা থেকেই শিল্পের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন, পরবর্তীকালে ১৪ বছর বয়সে শুরু হয় তার যথাযথ শিল্পশিক্ষা, তখন থেকেই ম্যাক্স ক্লিংগার এর কাজ দেখে এবং লেখা পড়ে তিনি বুঝতে পারেন ছবি আঁকিয়ে হওয়ার চেয়ে গ্রাফিক্স এবং ভাস্কর্য তাঁকে বেশি আকর্ষণ করছে। মাতৃকুলসূত্রে তিনি পেয়েছিলেন ধর্মীয় মন, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।তাই তাঁর কাজের মধ্যে উঠে এসেছে চিরকালীন বিত্তহীন মানুষের জীবন যন্ত্রণা,দৈনন্দিন নগরযাপন, সভ্যতার সমতলে যুদ্ধ,হিংসা, মৃত্যু। ছোট থেকেই মৃত্যু দেখেছেন বারবার,জন্মসুত্রে জার্মানীর মানুষ হওয়ায় ভয়ানকভাবে দেখেছেন দুটি বিশ্বযুদ্ধ,দ্বিতীয় যুদ্ধপূর্ব নাৎসী নিপীড়ন ও নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের সামনে সাম্যের বিপন্নতা,যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বস্ত সমাজ ও অর্থনীতি, যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে তাঁর সন্তানের প্রাণ, ভেঙ্গে দিয়েছে তার স্টুডিও ও বাড়ি, নষ্ট হয়ে যায় অজস্র শিল্পকর্ম। ছেলেবেলা থেকেই এতো প্রিয়জনের মৃত্যু দেখেছেন,ভাই-বোন এর মৃত্যু তাঁর মনে এক বিপন্নতার জন্ম দিয়েছিলো। পরবর্তীকালে যুদ্ধে সন্তানের ও পৌত্রের মৃত্যুরও সাক্ষী হতে হয়েছে। এতো মৃত্যু তার মনে এনে দিয়েছিলো, মানসিক বৈকল্য দীর্ঘ অবসাদ ও হ্যালুসিনেশন।তাই হয়তো তাঁর ছবি বাস্তববাদী হয়েও অন্য এক রূপকথার জগতের কথা বলে।তাঁর ছবি সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম যুদ্ধবিরোধী ছবি,দরিদ্রের জীবনযন্ত্রণার ছবি, ধনতান্ত্রিক নিপীড়নের আগ্রাসী মুখে প্রলেতারিয়েতের লড়াইয়ের ছবি,সর্বোপরি সন্তানহারা মায়ের এক চিরকালীন আর্তির ছবি।ক্যোলউইজ এর ছবির বিষয় সুন্দর নয়, অসুন্দরের মর্মবেদনা তাঁর ছবির মূলসুর। তাঁর ছবির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কম রঙের ব্যবহার বা বলা ভালো শুধুমাত্র সাদা ও কালো রঙের ব্যঞ্জনায় সমাজের প্রান্তিক মানুষ, চাষী, শ্রমিক, তাঁতী তাদের ভাঙাচোরা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের ছাপ রেখে গেছেন তাঁর চারকোলে আঁকা অবয়ব চিত্রে, এচিং-লিথোগ্রাফি-উডকাট এ, ভাস্কর্যে। ক্যোলউইজের অজস্র সাদাকালো ছবির মায়ায় আমরা খুঁজে পাই এক সন্তানহারা অসহায় মায়ের বেদনা,হাহাকার। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি, মা ও সন্তানকে ঘিরে বহু রচনা আমাদের মাথা নত করে একজন সভ্য মানুষ হিসাবে।এই হাহাকার বা বোবা কান্না বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাৎসী আগ্রাসন ও যুদ্ধের ভয়াবহতা আমাদের নির্বাক করে,কান্নাকে শব্দহীন করে দেয়, এছাড়া আর কীইবা করার থাকে একজন সাধারণ মানুষের? সভ্যতার সেই কীটক্লিষ্ট, যন্ত্রণাদগ্ধ প্রাণ ক্যোলউইজ আত্মস্থ করেছিলেন নিজের জীবন জুড়ে,সন্ধান করেছিলেন হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে সভ্যতার সংকট, রচনা করেছিলেন তার নির্ভান অবয়ব, মানবতার দলিল। সারাজীবন অজস্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁর ছবি স্থান পেয়েছে বিশিষ্ট মিউজিয়াম এ, প্রদর্শনীতে। প্রুশিয়ান একাডেমী অফ আর্টস এ শিল্পশিক্ষা দিয়েছেন প্রথম মহিলা শিক্ষক হিসেবে। বিশ্বের অন্য দেশে বসবাসের আমন্ত্রণ পেলেও হাজার অসুবিধা ও বাধা  সত্ত্বেও কখনো ছেড়ে চলে যাননি তাঁর মাতৃভূমি। ২২ শে এপ্রিল ১৯৪৫,শিল্পী ক্যাথে ক্যোলউইজ এর জীবনাবসান হয়।
তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: অন্তর্জাল ও ক্যাথে ক্যোলউইজ মিউজিয়াম 

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০২৩

ভিনসেন্ট যখন শিল্প শিক্ষার্থী

একজন শিল্পীর সৃজনশীলতার পরিমাপ করতে বা তুলনা করতে আমরা আজও তুলনা টানি পাবলো পিকাসো বা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এর,হয়তো আরো অনেক বছর স্কেলের মাপে এই দুটি এককই জ্বলজ্বল করবে। আমরা মুগ্ধ হই ভ্যান গঘের চূড়ান্ত সৃজনশীল সত্ত্বার ঝলক দেখে, যা সব প্রচলিত ধারাকে ভেঙ্গে চুরে, উপেক্ষা করে ছবিকে এক নতুন মাত্রায় উত্তরণ ঘটায়। কিন্তু ট্র্যাডিশন বা চিরকালীন যাকিছু,তাকে কি সত্যিই উপেক্ষা করেছিলেন এঁরা? হয়তো এমনভাবে সরলীকরণ করা যাবে না বিষয়টা। 
গ্রেট আর্টিস্ট যারা, তাদের ক্রিয়েটিভ কাজের পাশাপাশি সবসময়ই চালিয়ে যেতে হয় চিরকালীন সৃষ্টির অনুকরণ,এতে তার কবজির জোর তো বাড়ে নির্ঘাৎ, তদুপরি একই ছবি,একই কম্পোজিশন ভিন্ন ভিন্ন হাতে পড়ে হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ নতুন ছবি। তাঁরা দক্ষ চাক্ষিক, কম্পোজিশন অনুকরণ বা অনুসরণ করলেও রঙের প্রয়োগ,ব্রাশের চলন সেই ছবিকে নিয়ে আসে তাঁর ঘরানার। এভাবে ছবির নবজন্ম হয়।

ভিনসেন্ট তাঁর সৃষ্টি-আয়ুষ্কালে বেশ কিছু অন্যের ছবির কপি করেছেন, তারমধ্যে জাপানি উডকাট ছবির প্রিন্টের মোহে পড়েছিলেন কিছুকাল,পড়ারই কথা, যেকোনো সংবেদনশীল শিল্পীর মনেই মায়া জাগায় মোলায়েম রঙের প্রলেপ,দৃঢ় রেখার চলন। ১৮৮৭ সাল অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষদিকে এবং তার ছবিজীবনের চরম উৎকর্ষের মুহূর্তে ভিনসেন্ট তিনটি জাপানি উডকাট প্রিন্টের অনুকরণ করেন,এই ধারার ছবির প্রতি তাঁর আকর্ষণ বরাবরই ছিল যথেষ্ট, এবং বেশকিছু প্রিন্ট তিনি সংগ্রহও করেছিলেন।
 সেই সময়কালে যে তিনটি ছবি ভিনসেন্ট অনুকরণ করেছিলেন, তারমধ্যে দুটি ছবির শিল্পী Utagawa Hiroshige এবং অপর ছবির শিল্পী Kesai Eisen, ছবিগুলি সবই উডকাট পদ্ধতিতে আঁকা, ভিনসেন্ট এই ছবিগুলির প্রিন্ট দেখেই অনুকরণ করেন। শুধুমাত্র 'Courtesan' শীর্ষক ছবিটি তিনি পান 'Paris illustré' ম্যাগাজিনের কভারে,এটি ১৮৮৬ সালে ছাপা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই ভিনসেন্ট মূল ছবির ড্রয়িং, কম্পোজিশন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এবং এনলার্জ অর্থাৎ সমানুপাতিক হারে বড়ো করার জন্য প্রথমেই গ্রিডলাইন ব্যবহার করে ড্রয়িং এর লেআউট করে নিয়েছেন।

যেমন এই ছবিটির ক্ষেত্রে মূল ছবিটি ছিল ২৫.৪ সেমি x ৩৭ সেমি মাপের,১৮৫৭ সালে Utagawa Hiroshige এর আঁকা 'Plum garden in Kameido' , জাপানি কাগজের ওপর রঙিন উডকাট প্রিন্ট। ভ্যান গঘ যখন ১৮৮৭ সালের অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি আঁকলেন ক্যানভাসে তেলরঙ দিয়ে।
প্রথমেই সেটিকে পেন্সিল,কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং করে নিলেন হাত মকশো করার জন্য , গ্রিড ড্রয়িংয়ের সুবিধা নিয়ে আকারেও বাড়ালেন ছবিটি, তাঁর ছবির আকার দাঁড়ালো ৫৫.৬ সেমি x ৪৬.৮ সেমি, যখন নিজের ছবিতে প্রবেশ করলেন,শিল্পবোধ থেকে ছবিটির উত্তরণ ঘটালেন,মূল ছবিতে গাছের কাণ্ডর রঙ ছিল কালো ও ধূষর,ভ্যান গঘের ছবিতে সেগুলি হলো লাল ও নীল। ছবির রঙ হলো অনেক উজ্জ্বল। ছবির বাইরের দিকে যোগ করলেন কমলা রঙের মোটা সীমান্তরেখা,তার ওপর অন্য জাপানি ছবি দেখে প্রথাগত ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার করলেন,ফলে ছবিটির রূপ বদলে গেল, নতুন একটি ছবির জন্ম হলো এভাবেই।

আবার এই ছবিটির কথায় আসা যাক, ছবিটির শিরোনাম 'Bridge in the rain' এটিও Utagawa Hiroshige এর আঁকা। ভিনসেন্ট ঐ একই সময়ে অর্থাৎ ১৮৮৭র অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি কপি করছেন, আগের ছবিটির মতো একইভাবে ছবির রেফারেন্স থেকে মূল কম্পোজিশন নিয়ে রঙ ও রেখার ক্ষেত্রে বদলে নিচ্ছেন চলন। ছবির চারপাশে ঘন সবুজ রঙের সীমান্ত রেখা দিয়ে ঘিরে দিচ্ছেন এবং জাপানি অক্ষরশিল্পকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করছেন। ভিনসেন্টীয় মেজাজ অনুযায়ী রেখা অনেক ঋজু ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এইসব ছবিতে, রঙের প্রয়োগও নিজস্ব ঘরানায়, উজ্জ্বল - ঝলমলে।

তৃতীয় ছবি অর্থাৎ Kesai Eisen এর উডকাট ছবি 'Courtesan' এর অনুকরণচিত্রটি ভ্যান গঘ আঁকছেন প্রথমে পেন্সিল, কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং হিসেবে কাগজে, তারপর মূল ছবিটি আঁকছেন ১০০.৭ সেমি x ৬০.৭ সেমি মাপের,কাপড়ের ওপর তেলরঙে।ছবিতে যে চরিত্রটি রয়েছে,সে একজন রাজ পরিবারের প্রতিনিধি, মেয়েটির চুলের ধরণ ও পোশাক এবং বেল্ট দেখে সেটা অনুমেয়,বেল্টটি ভিনসেন্ট দেখিয়েছেন কিমোনোর সামনের দিকে। এই ছবিতে ভিনসেন্ট আরেকটু এগিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন ছবির পশ্চাদপট নিয়ে, সেখানে একটি ভিন্ন ছবির খণ্ড খণ্ড অংশ দেখা যাচ্ছে। একটি ছোট জলাশয়, সেখানে জলপদ্ম ও জলজ উদ্ভিদের রাশি, বক বা সারস জাতীয় পাখি, বাঁশগাছের কাণ্ড ও পাতা,বাঙ প্রভৃতি দিয়ে সাজানো নিটোল আরেকটি কম্পোজিশন,এটিও জাপানি ছবির ধারা থেকেই নেওয়া, শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন।

এভাবেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সর্বকালের সেরা একজন শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও নিরন্তর ভাঙ্গাগড়ার খেলা চালিয়েছেন নিজের মধ্যে, ছাত্রের মতো নিবিড় অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন অতীত ঐশ্বর্যকে, তার থেকে প্রেরণা নিয়ে সৃষ্টি করেছেন নিজের শিল্প। ক্রমাগত গ্রহণ-বর্জন,পরিশীলন ও সংযুক্তিকরণের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে করে তুলেছেন আরো ধারালো, অভিজ্ঞ ও খোলা মানে শিল্পী হিসেবে।

তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: ভ্যান গঘ মিউজিয়াম