বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২

ফ্রিডা কাহলো : জীবন যন্ত্রণার শিল্পী

শিল্পী ফ্রিডা কাহলো –বোধহয় পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক চর্চিত নারীশিল্পী। মেক্সিকান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রথিতযশা শিল্পী হলেন ফ্রিডা কাহলো। ফ্রিডার জন্ম এই মেক্সিকোতেই, ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই জুলাই।যে বাড়িটিতে এখন 'ফ্রিডা কাহলো মিউজিয়াম',যে বাড়িটির ডাকনাম 'The Blue House', সেখানেই ফ্রিডার জন্ম ও জীবনের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত করা এবং তার জীবনের শেষ দিনগুলিও এখানেই কেটেছে।
ফ্রিডার ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে তার জীবন যন্ত্রণা,শৈশবের পোলিও রোগে আংশিক পঙ্গুত্ব বা ১৯২৫এর সেই পথ দুর্ঘটনা, যার অভিশাপ তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে বাকী জীবন। হয়তো একধরণের মানসিক-শারীরিক বিপন্নতা তাকে আশ্রয় করেছিল সারাজীবন,তাই তার ছবিতে বিপন্নতা এবং ফ্যান্টাসিকে আশ্রয় করে বিপন্নতা থেকে উত্তরণের রূপ খুব স্পষ্ট।
দিয়েগোর কাছে বারবার ফিরে যাওয়া এবং বিচ্ছেদ,সন্তানলাভের তীব্র ইচ্ছে কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা,বারংবার ঘরের টান এবং এক দ্বৈতসত্ত্বার টানে জেরবার ও ধ্বস্ত, একইসঙ্গে  বহুগামীতা ও সমকামীতাও ফিরে ফিরে এসেছে তার জীবনে,কখনো দিয়েগো রিভেরার প্রভাব তাকে উৎসাহ দিয়েছে আবার কি এক অস্থিরতার টানে নিজেকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছেন,নিজেকেই নিজে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজেকে খুঁড়ে তুলে এনেছেন ছবির বিষয় স্যুররিয়ালিস্ট ফর্মে,নিজের একঘেয়ে খণ্ডজীবন,অনেক চাওয়া এবং না পাওয়ার বিষযন্ত্রণা।একদা নিজের অবসাদ থেকে যে শিল্পের জন্ম তাই তাকে অমর করেছে, মানুষ আসলে দুঃখ-বিষাদ ভালোবাসে।ফ্রিডার প্রিয় সেই বিষাদময় নীলবাড়ি এখন তার নামাঙ্কিত মিউজিয়াম,যেখানে তার সব ছবি জুড়ে আজও আলোছায়া খেলা করে,একাধারে আনন্দ-বিষাদের আবাস,আজও আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করায় তার সেইসব অধিবাস্তববাদী ছবি যা মূলত আত্মজৈবনিক।ফ্রিডার ছবির চরিত্র হিসেবে বারংবার ফিরে এসেছেন শিল্পী নিজেই, তাঁর বহু ছবিই আসলে আত্ম প্রতিকৃতি, এবং এখানে শিল্পী সৎ,তার উপস্থাপনের আঙ্গিক রূপকধর্মী ও কল্পনাপ্রবণ হলেও ছবির মনস্তত্ত্ব সমসময়কে,তার জীবনের টানাপোড়েন কে যথাযথভাবে ব্যক্ত করে।ফ্রয়েড এর মনস্তাত্ত্বিক লেখা পড়ে ছবিতে নিজের জীবনের প্রতিস্থাপন ঘটাতে তাঁর হয়তো কিছুটা সহজবোধ হয়েছিল। জীবনের যেকোনো ঘটনাকেই তাই শিল্পে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। যেমন তাঁর 'Two fridas' ছবিতে তাঁর দ্বৈত উপস্থিতি,হাতে হাত রেখে,একজন ঐতিহ্যের অনুসারী,অপর জন আধুনিকা,ডিয়েগো রিভেরার সঙ্গে বিচ্ছেদের অব্যবহিত পরেই ভগ্নহৃদয়ে এই চিত্র রচনা, তাঁর মানসিক টানাপোড়েন,আত্ম-দ্বন্দ্ব এই ছবিতে স্পষ্ট।
ফ্রিডার ছবিতে প্রায়শই দেখা যায় ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত,যন্ত্রণাদগ্ধ। মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহও প্রায়শই দৃশ্যমান বা বাইরের জল-হাওয়ার পৃথিবীতে প্রকাশিত। মানসিক ও শারীরিক ভাঙ্গাচোরা জগতের মনস্তাত্ত্বিক দৃশ্যায়ন ফ্রিডার ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আরো কিছু কিছু বিষয় বা বস্তু তার ছবি জীবনে ফিরে ফিরে এসেছে বারবার, যেমন- চুল বাঁধার বাহারী ফিতে,মাথার চুল ও বিভিন্ন পোষা জীবজন্তু ও পাখি। বিধ্বস্ত জীবনকে গুছিয়ে বারবার সুন্দর করে বাঁধতে চেয়েছেন শিল্পী, কিন্তু তা বারবার গেছে ভেঙ্গে। মানুষের কাছ থেকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আশ্রয় খুঁজেছেন পশুপাখির কাছে, নিজের পঙ্গুত্ব যখন চূড়ান্ত হতাশ করেছে বা বাইরের আঘাত এসেছে, তখন ভেঙ্গে চুরমার করেছেন নিজেকে, নিজের ছবিকে।
সংক্ষিপ্ত ৪৭ বছরের জীবনে ফ্রিডা মাত্র একটি একক প্রদর্শনী করার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে, তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগের বছরে।
ফ্রিডার ছবি তাই জীবন যন্ত্রণার ছবি,অনেক না পাওয়া ইচ্ছের ছবি,আমাদের অবদমিত কামনা-বাসনার ছবি।তাই আজও দর্শক মিলিয়ে নেন নিজেকে ফ্রিডার ছবির সঙ্গে,যে যন্ত্রণা আমাদের স্তব্ধ করে তারাই ফ্রিডার ছবিতে সবাক হয়ে ফিরে ফিরে আসে।

তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: অন্তর্জাল

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন