গ্রেট আর্টিস্ট যারা, তাদের ক্রিয়েটিভ কাজের পাশাপাশি সবসময়ই চালিয়ে যেতে হয় চিরকালীন সৃষ্টির অনুকরণ,এতে তার কবজির জোর তো বাড়ে নির্ঘাৎ, তদুপরি একই ছবি,একই কম্পোজিশন ভিন্ন ভিন্ন হাতে পড়ে হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ নতুন ছবি। তাঁরা দক্ষ চাক্ষিক, কম্পোজিশন অনুকরণ বা অনুসরণ করলেও রঙের প্রয়োগ,ব্রাশের চলন সেই ছবিকে নিয়ে আসে তাঁর ঘরানার। এভাবে ছবির নবজন্ম হয়।
ভিনসেন্ট তাঁর সৃষ্টি-আয়ুষ্কালে বেশ কিছু অন্যের ছবির কপি করেছেন, তারমধ্যে জাপানি উডকাট ছবির প্রিন্টের মোহে পড়েছিলেন কিছুকাল,পড়ারই কথা, যেকোনো সংবেদনশীল শিল্পীর মনেই মায়া জাগায় মোলায়েম রঙের প্রলেপ,দৃঢ় রেখার চলন। ১৮৮৭ সাল অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষদিকে এবং তার ছবিজীবনের চরম উৎকর্ষের মুহূর্তে ভিনসেন্ট তিনটি জাপানি উডকাট প্রিন্টের অনুকরণ করেন,এই ধারার ছবির প্রতি তাঁর আকর্ষণ বরাবরই ছিল যথেষ্ট, এবং বেশকিছু প্রিন্ট তিনি সংগ্রহও করেছিলেন।
সেই সময়কালে যে তিনটি ছবি ভিনসেন্ট অনুকরণ করেছিলেন, তারমধ্যে দুটি ছবির শিল্পী Utagawa Hiroshige এবং অপর ছবির শিল্পী Kesai Eisen, ছবিগুলি সবই উডকাট পদ্ধতিতে আঁকা, ভিনসেন্ট এই ছবিগুলির প্রিন্ট দেখেই অনুকরণ করেন। শুধুমাত্র 'Courtesan' শীর্ষক ছবিটি তিনি পান 'Paris illustré' ম্যাগাজিনের কভারে,এটি ১৮৮৬ সালে ছাপা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই ভিনসেন্ট মূল ছবির ড্রয়িং, কম্পোজিশন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এবং এনলার্জ অর্থাৎ সমানুপাতিক হারে বড়ো করার জন্য প্রথমেই গ্রিডলাইন ব্যবহার করে ড্রয়িং এর লেআউট করে নিয়েছেন।
যেমন এই ছবিটির ক্ষেত্রে মূল ছবিটি ছিল ২৫.৪ সেমি x ৩৭ সেমি মাপের,১৮৫৭ সালে Utagawa Hiroshige এর আঁকা 'Plum garden in Kameido' , জাপানি কাগজের ওপর রঙিন উডকাট প্রিন্ট। ভ্যান গঘ যখন ১৮৮৭ সালের অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি আঁকলেন ক্যানভাসে তেলরঙ দিয়ে।
প্রথমেই সেটিকে পেন্সিল,কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং করে নিলেন হাত মকশো করার জন্য , গ্রিড ড্রয়িংয়ের সুবিধা নিয়ে আকারেও বাড়ালেন ছবিটি, তাঁর ছবির আকার দাঁড়ালো ৫৫.৬ সেমি x ৪৬.৮ সেমি, যখন নিজের ছবিতে প্রবেশ করলেন,শিল্পবোধ থেকে ছবিটির উত্তরণ ঘটালেন,মূল ছবিতে গাছের কাণ্ডর রঙ ছিল কালো ও ধূষর,ভ্যান গঘের ছবিতে সেগুলি হলো লাল ও নীল। ছবির রঙ হলো অনেক উজ্জ্বল। ছবির বাইরের দিকে যোগ করলেন কমলা রঙের মোটা সীমান্তরেখা,তার ওপর অন্য জাপানি ছবি দেখে প্রথাগত ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার করলেন,ফলে ছবিটির রূপ বদলে গেল, নতুন একটি ছবির জন্ম হলো এভাবেই।
আবার এই ছবিটির কথায় আসা যাক, ছবিটির শিরোনাম 'Bridge in the rain' এটিও Utagawa Hiroshige এর আঁকা। ভিনসেন্ট ঐ একই সময়ে অর্থাৎ ১৮৮৭র অক্টোবর - নভেম্বর নাগাদ ছবিটি কপি করছেন, আগের ছবিটির মতো একইভাবে ছবির রেফারেন্স থেকে মূল কম্পোজিশন নিয়ে রঙ ও রেখার ক্ষেত্রে বদলে নিচ্ছেন চলন। ছবির চারপাশে ঘন সবুজ রঙের সীমান্ত রেখা দিয়ে ঘিরে দিচ্ছেন এবং জাপানি অক্ষরশিল্পকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করছেন। ভিনসেন্টীয় মেজাজ অনুযায়ী রেখা অনেক ঋজু ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এইসব ছবিতে, রঙের প্রয়োগও নিজস্ব ঘরানায়, উজ্জ্বল - ঝলমলে।
তৃতীয় ছবি অর্থাৎ Kesai Eisen এর উডকাট ছবি 'Courtesan' এর অনুকরণচিত্রটি ভ্যান গঘ আঁকছেন প্রথমে পেন্সিল, কলম ও কালিতে গ্রিডলাইন ড্রয়িং হিসেবে কাগজে, তারপর মূল ছবিটি আঁকছেন ১০০.৭ সেমি x ৬০.৭ সেমি মাপের,কাপড়ের ওপর তেলরঙে।ছবিতে যে চরিত্রটি রয়েছে,সে একজন রাজ পরিবারের প্রতিনিধি, মেয়েটির চুলের ধরণ ও পোশাক এবং বেল্ট দেখে সেটা অনুমেয়,বেল্টটি ভিনসেন্ট দেখিয়েছেন কিমোনোর সামনের দিকে। এই ছবিতে ভিনসেন্ট আরেকটু এগিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন ছবির পশ্চাদপট নিয়ে, সেখানে একটি ভিন্ন ছবির খণ্ড খণ্ড অংশ দেখা যাচ্ছে। একটি ছোট জলাশয়, সেখানে জলপদ্ম ও জলজ উদ্ভিদের রাশি, বক বা সারস জাতীয় পাখি, বাঁশগাছের কাণ্ড ও পাতা,বাঙ প্রভৃতি দিয়ে সাজানো নিটোল আরেকটি কম্পোজিশন,এটিও জাপানি ছবির ধারা থেকেই নেওয়া, শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন।
এভাবেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সর্বকালের সেরা একজন শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও নিরন্তর ভাঙ্গাগড়ার খেলা চালিয়েছেন নিজের মধ্যে, ছাত্রের মতো নিবিড় অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন অতীত ঐশ্বর্যকে, তার থেকে প্রেরণা নিয়ে সৃষ্টি করেছেন নিজের শিল্প। ক্রমাগত গ্রহণ-বর্জন,পরিশীলন ও সংযুক্তিকরণের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে করে তুলেছেন আরো ধারালো, অভিজ্ঞ ও খোলা মানে শিল্পী হিসেবে।
তথ্যসূত্র ও চিত্রঋণ: ভ্যান গঘ মিউজিয়াম
এই প্রতিবেদনে ভ্যান গগকে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়েছে। লেখার মান ও শব্দবিন্যাশ প্রশংসার যোগ্য। আরও নিরন্তর এই ধরনের শিল্প বিশ্লেষণ কামনা করছি।
উত্তরমুছুন